অমানবিক দাসপ্রথা কে ইসলাম হালাল করেছে

হএকজন মানুষ বেঁচে থাকার অধিকার। জন্মলাভের মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানবশিশু স্বাধীন এবং মর্যাদাসম্পন্ন। খাঁচায় বন্দী পাখী কিংবা চিড়িয়াখানায় জন্তু জানোয়ারের মত তার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া যায় না। এই মৌলিক অধিকারটিই বিবৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের প্রথম ধারাটিতে [1] –

ধারা ১
সমস্ত মানুষ স্বাধীনভাবে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তাঁদের বিবেক এবং বুদ্ধি আছে; সুতরাং সকলেরই একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব নিয়ে আচরণ করা উচিৎ।

কিন্তু এই অধিকারটি যখন কেড়ে নেয়া হয়, তখন আসলে মনুষ্যত্বের সবচেয়ে বড় অপমান হয়। সেই কারণেই মানব ইতিহাসে মানুষের দ্বারা সংঘটিত সবচাইতে ভয়ঙ্কর অপরাধ এবং অন্ধকার এক অধ্যায়ের নাম দাসপ্রথা। প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ, এমনকি এই আধুনিক যুগেও অনেক সমাজেই দাসপ্রথা সামাজিক ও আইনানুগভাবে অনুমোদিত ছিল। এ ব্যবস্থায় বাজারে মানুষের আনুষ্ঠানিক বেচা-কেনা চলত এবং কিনে নেয়া মানুষটি ক্রেতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি রূপে কাজ করতে বাধ্য থাকতো। তার কোন স্বাধীন ইচ্ছা কিংবা স্বাধীনতা, কোনটিই থাকতো না। প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রায় সব শাসন ব্যবস্থাতেই দাসপ্রথার প্রচলন ছিল। গবাদিপশুর মত বাজার বসতো, সেখানে প্রকাশ্যেই মানুষেরও কেনাবেচা চলত। শেকলে বেঁধে বন্দী মানুষদের সেখানে ওঠানো হতো, মূল্য নির্ধারণ করা হতো, দরাদরি করা হতো, গরু ভেড়ার মত পরীক্ষা করে দেখা হতো, এরপরে এর মালিকানা হস্তান্তর করা হতো।

আজকের দিনে এসব কল্পনা করাটিও অসম্ভব বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সেই সময়ে আসলেই এসব প্রথার বহুল প্রচলন ছিল। শুধু আইন পুস্তক ও প্রশাসনিক গ্রন্থেই নয়, এ প্রথা ধর্মগুলোতেও স্বীকৃতি ছিল। মানবিক ধর্মের দাবীদার অনেকগুলো ধর্মই একে বিলুপ্ত ঘোষণা না করে অনেক ক্ষেত্রে বরঞ্চ একে বৈধতাই দিয়েছে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের সেইসব অন্ধকার সময় পেরিয়ে মানব সভ্যতা আধুনিক যুগে এসে পৌঁছোবার পর সারা পৃথিবীতে এখন দাসপ্রথা একটি নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে পরিগণিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের চতুর্থ ধারায় পরিষ্কারভাবে সেটি আমরা দেখতে পাই [1] –

ধারা ৪
কা‌উকে অধীনতা বা দাসত্বে আবদ্ধ করা যাবে না। সকল প্রকার ক্রীতদাস প্রথা এবং দাসব্যবসা নিষিদ্ধ করা হবে।

এই ধারার ফলাফল হিসেবেই, সারা পৃথিবীতে দাসপ্রথা আজকে নিষিদ্ধ এবং কাউকে কোন অবস্থাতেই দাস বানানো, দাস কেনাবেচা, দাসব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আমরা আধুনিক মানুষ কোন অবস্থাতেই দাসপ্রথাকে আর কোনদিনই পৃথিবীতে দেখতে চাই না। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আন্তর্জাতিক আইনকে অমান্য করে কোন না কোনভাবে এখনো দাসপ্রথা চালু রাখা হয়েছে, কিন্তু যে কোন মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষই বুঝবে, এই দাসপ্রথা কত বীভৎস একটি বিষয়।

ইতিহাস থেকে মধ্যযুগের ইউরোপে সর্বপ্রথম পঞ্চদশ শতকের শুরুতে দাসপ্রথা নিষিদ্ধকরণের যথাযথ সূচনা আমরা দেখতে পাই। দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তৎকালীন সময়ে একটি স্বাধীন নগররাষ্ট্র হিসেবে থাকা রাগুসা অথবা দুব্রভনিক নামক নগররাষ্ট্রটিতে, যা কিনা আধুনিক ক্রোয়েশিয়া রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত, দাসপ্রথা সর্বপ্রথম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ১৪১৬ সালে। আধুনিক যুগে নরওয়ে এবং ডেনমার্ক সর্বপ্রথম ১৮০২ সালে দাসবাণিজ্য বন্ধ করে। পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে ইউরোপ এবং আমেরিকাতে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করার আইনটি প্রণয়নের জন্য আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে তার স্বজাতি শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করতে হয়েছিল। আমেরিকার ইতিহাসে এই যুদ্ধ আমেরিকান সিভিল ওয়ার বা আমেরিকান গৃহযুদ্ধ নামে পরিচিত, যা ১৮৬১ সালে শুরু হয়ে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত চলেছিল। এ যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে তবেই আব্রাহাম লিংকন পুরো আমেরিকা জুড়ে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করার আইনটি বলবৎ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সর্বশেষ যেই দেশগুলো দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করার আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করে, তাদের মধ্যে মৌরিতানিয়া অন্যতম। ১৯৬২ সালে গ্রেইট ব্রিটেনের সরাসরি চাপের মুখে সৌদি আরব এবং ইয়েমেন দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করতে সম্মত হয়, এবং ১৯৭০ সালে একইভাবে ব্রিটেনের ক্রমাগত চাপের কারণে ওমানও দাসপ্রথাকে নিষিদ্ধ করে।
দাসত্ব’ অর্থ হল যেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোন মানুষকে একটি অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে তার স্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়া এবং তাকে পারিশ্রমিক ছাড়াই শ্রম দিতে বাধ্য করার এক বর্বর সংস্কৃতি। একজন মালিক তার দাসকে যে কোন সময়ে বিক্রি করে দিতে পারেন, এবং মালিকই নির্ধারণ করতে পারেন তাকে দিয়ে কী কাজ করানো হবে। এই ক্ষেত্রে দাসের কোন মতামত বা ইচ্ছাকে কোন গুরুত্ব দেয়া হয় না। প্রাচীনকালে এবং মধ্যযুগে মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাদেরকে দাসে পরিণত করা হতো। দাসত্ব হতে পারে কোন মানুষ শত্রুর হাতে আটক হলে, জন্মসূত্রে বা ক্রয় করার মাধ্যমে। এমনকি উপহার হিসেবেও দাস আদান প্রদান মধ্যযুগে বহুল প্রচলিত ছিল।

একজন সাধারণ শ্রমিকের কর্মকাঠামোর সাথে একজন দাসের কর্মকাঠামোর সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যিনি শ্রমিক, তার নিজের ইচ্ছায় কাজের স্থান বা নিয়োগকারীকে ত্যাগ করার, কাজ না করার বা শ্রমের মজুরি পাবার পূর্ণ অধিকার থাকে। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনুসারে একজন সাধারণ শ্রমিকের সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং ছুটি পাওয়ার অধিকার থাকে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুসারে, একজন শ্রমিককে কয় ঘণ্টা কাজ করানো যাবে, সপ্তাহে কয়ঘণ্টা তিনি কাজ করতে পারবেন, বছরে কতদিন ছুটি নিতে পারবেন, অসুস্থ হলে কিংবা উৎসবকালীন কতদিন ছুটি পাবেন সেগুলো আইন দ্বারা নির্ধারিত। কিন্তু একজন শ্রমিকের সাথে একজন দাসের পার্থক্য এখানেই যে একজন দাসের কখনো কাজের স্থান বা মালিককে ত্যাগ করার, কাজ না করার বা শ্রমের মজুরি পাবার অধিকার থাকে না। ইসলাম ধর্মে দাসপ্রথাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং ইসলামের বিধান যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য, তাই কিয়ামত পর্যন্ত যতদিন ইসলাম থাকবে, ততদিন দাসপ্রথার অস্তিত্ব থাকবে।
যুদ্ধবন্দী বা দাসী সহবাস হচ্ছে ‘ধর্ষণ’

ধর্ষণের সংজ্ঞা থেকে আমরা জানি যে,

সাধারণত একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন- কোনো অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি) এরকম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত [4] [5] [6]। দুইটি পক্ষের মধ্যে সংঘাত বা যুদ্ধের সময়ও ধর্ষণ কিংবা যুদ্ধবন্দীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের মত ঘটনাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ধরণের ধর্ষণ গণহত্যার একটি উপাদান হিসেবেও স্বীকৃত।

একজন দাসী কিংবা যুদ্ধে বন্দী নারীর কখনো যৌনকাজে সম্মতি দানের অধিকার থাকে না। কারণ এই সময়ে তাদের না বলার কোন স্বাধীনতা থাকে না। না বলার স্বাধীনতা না থাকাটিই সম্মতির লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হয়। এই কারণে পুরো সভ্য বিশ্বে বন্দী হওয়া কিংবা দাসত্বের শেকলে আবদ্ধ মানুষের সাথে যে কোন যৌন আচরণ ধর্ষণ এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত। একজন যুদ্ধবন্দিনী, যার বাবা ভাই থেকে শুরু করে সব আত্মীয় স্বজন বিপক্ষের সৈন্যদের হাতে নিহত হলো, সেই নারীর পক্ষে শত্রু সৈন্যদের সাথে স্বেচ্ছায় যৌনকর্ম করা রীতিমত একটি অবাস্তব ব্যাপার।

ব্যাপারটি বুঝতে কষ্ট হলে আমি পাঠককে অনুরোধ করবো, নিজেকে সেই কাফেরের জায়গাতে বসিয়ে চিন্তা করে দেখুন, ভারতের সৈন্যরা আপনাকে হত্যা করে আপনার মা বোনকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে ধরে নিয়ে গেলে, আপনার মা বোন স্বেচ্ছায় সেইসব সৈন্যদের বিছানা গরম করবে কিনা। নিজের ওপর আসলে বিষয়টির ভয়াবহতা বোঝাটি সহজ হয়। একজন যুদ্ধে বন্দী হওয়া মানুষ যেই পরিস্থিতিতে থাকে, তখন স্বাধীনভাবে কোন ধরণের ভয়ভীতি বা চাপ প্রয়োগ ছাড়া তার যৌন সঙ্গী বেছে নেয়া সম্ভবই নয়। যুদ্ধে জয়ী সৈন্যরা তখন কর্তৃত্বশীল। তাই তারা যেটি নির্দেশ দিবে সেটিই পালন করতে হবে। আর সম্মতি তখনই সে দিতে পারবে, যখন সে প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাধীন এবং না বললে কোন ধরণের চাপের মুখে সে পড়বে না।

তখন যদি সে বিষয়টি মেনেও নেয়, তাহলেও ধরে নিতে হবে, তাকে ধর্ষণ করাই হয়েছে। কারণ মেনে নেয়া ছাড়া তার আর কী বা করার ছিল! তাই পুরো সভ্য বিশ্বে কোন পরাধীন বা যুদ্ধবন্দীর সাথে যৌনকর্ম সরাসরি ধর্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য বাঙালি নারী পাকসেনাদের হাতে ধরা পড়ে এবং ধর্ষণের শিকার হয়। বন্দী হওয়া মানুষদের কনসেন্ট না সম্মতি মূল্যহীন। তাই তাদের সাথে যেকোন যৌন আচরণই সংজ্ঞানুসারে ধর্ষণ এবং যুদ্ধাপরাধ। এটি গণহত্যার একটি উপাদানও বটে। একটি যুদ্ধে যারা বন্দী হয়, কিংবা বাজারে যাদেরকে বিক্রি করা হয়, সেইসব মানুষদের যেহেতু যৌন সঙ্গী বাছাই করার বা পছন্দ করার কোন সুযোগ থাকে না, যে তাকে কিনুক বা যে তার মালিক হোক তার সাথেই তার যৌন সঙ্গম করতে বাধ্য হতে হয়, এই কাজটি সংজ্ঞানুসারে ধর্ষণ। সেই হিসেবে ইসলামে বর্ণিত দাসী সহবত কিংবা যুদ্ধবন্দী নারীর সাথে মালিকের সহবাসের অনুমতি সম্পূর্ণভাবে ধর্ষণের সংজ্ঞায় পরে।

ইসলামে দাসপ্রথার সমর্থন ও বৈধতা

ইসলামের ইতিহাসে ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআন, ধ্রুপদী পণ্ডিতদের রচিত অসংখ্য তাফসীর এবং হাদিস গ্রন্থে দাসপ্রথার প্রসঙ্গ বারবার উঠে এসেছে এবং সেগুলোতে দাসপ্রথাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই লেখায়, আমরা ধীরে ধীরে সেই সকল আয়াত এবং হাদিসগুলো বিশদভাবে আলোচনা করব। কোরআনে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহই কিছু মানুষকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, অর্থাৎ আল্লাহই কাউকে দাস এবং কাউকে মালিক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। একইসাথে, আল্লাহ তিরস্কারের সুরে মানুষকে জিজ্ঞাসা করেছেন: “তোমরা কি তোমাদের দাসদের নিজেদের সম্পদ বা জীবনোপকরণের অংশীদার করো? যদি না করো, তাহলে আল্লাহ কেন তাঁর ইবাদতের অধিকার থেকে কিছুটা ছাড় দেবেন?” আসুন, এই আয়াতটি এবং মা’আরেফুল কোরআন থেকে এর তাফসীর বিশদভাবে পর্যালোচনা করি [24] [25],

আল্লাহ জীবনোপকরণে তোমাদের একজনকে অন্যজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে তারা তাদের অধীনস্থ দাস দাসীদেরকে নিজেদের জীবনোপকরণ হতে এমন কিছু দেয়না যাতে তারা এ বিষয়ে সমান হয়ে যায়; তাহলে কি তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করে?
— Sheikh Mujibur Rahman
আর আল্লাহ রিয্ক তোমাদের কতককে কতকের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন; কিন্তু যাদেরকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, তারা তাদের রিয্ক দাসদাসীদের ফিরিয়ে দেয় না। (এই ভয়ে যে,) তারা তাতে সমান হয়ে যাবে। তবে তারা কি আল্লাহর নিআমতকে অস্বীকার করছে?
— Rawai Al-bayan
আর আল্লাহ্‌ জীবনোপকরণে তোমাদের মধ্যে কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে তারা তাদের অধীনস্থ দাসদাসীদেরকে নিজেদের জীবনোপকরণ হতে এমন কিছু দেয় না যাতে তারা এ বিষয়ে তাদের সমান হয়ে যায় [১]। তবে কি তারা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ অস্বীকার করছে [২]?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

ইসলামের বিধান কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তনীয়

ইসলামের মৌলিক শিক্ষার মধ্যে অন্যতম হলো, নবী মুহাম্মদ (সা.) যেই ফয়সালা দেন, তা বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে মেনে নেওয়া এবং সেই ফয়সালার প্রতি নিজেকে সমর্পণ করাই প্রকৃত ইমানের পরিচয়। এ বিষয়ে কুরআনের সুরা নিসার ৬৫ নাম্বার আয়াতের অনুবাদ থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, নবীর আদেশ ও রায় মেনে চলা বাধ্যতামূলক এবং তা কোনোভাবেই অমান্য করা যাবে না। নবী মুহাম্মদ-এর জীবদ্দশায় তার ওপর ওহী (ঐশী বার্তা) নাজিল হতো, যা ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর নির্দেশাবলী। কিন্তু নবী মুহাম্মদ-এর ইন্তেকালের পর ওহী নাজিলের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে, ইসলামের মূল বিধান এবং শরিয়াহ আইনগুলোতে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা পরিমার্জন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং হারাম বলে বিবেচিত। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, নবীর রায় বা আদেশ পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই, কারণ ওহী বা নবীর ফয়সালা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি প্রেরিত নির্দেশনা, যা সর্বদা অপরিবর্তনীয় এবং শাশ্বত সত্য হিসেবে স্বীকৃত [26] –

একইসাথে, ইসলামের একটি অপরিবর্তনীয় নীতি হলো, নবী মুহাম্মদ যেসব কাজকে নিজে নিষিদ্ধ করেননি বা হারাম ঘোষণা করেননি, তা পরবর্তীতে কোনো মুসলমান বা আলেমের পক্ষে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা বৈধ নয়। নবী মুহাম্মদ-এর সিদ্ধান্ত ও বিধানই ইসলামের চূড়ান্ত নীতি হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং তার অনুমোদিত বা বৈধতা দেওয়া কাজগুলোকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা কারো নেই। একইভাবে, নবী মুহাম্মদ যে বিষয়গুলোকে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে গেছেন, সেগুলোকে কেউই পরবর্তীতে হালাল বা বৈধ ঘোষণা করতে পারবে না। ইসলামের দৃষ্টিতে, এটি একটি অপরিবর্তনীয় আইন, যা নবীর মৃত্যুর পরও অক্ষুণ্ণ থাকে। ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী, নবী মুহাম্মদ-এর ফয়সালা এবং নির্দেশাবলী সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত, তাই কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা এই বিধানগুলোতে পরিবর্তন আনার বা নতুন বিধান জারি করার অধিকার রাখে না। তাঁর নির্ধারিত হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধের সীমারেখাকে অমান্য করা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের বিপরীত বলে বিবেচিত হয়। এই বিষয়ে বুখারী শরীফের একটি হাদিস দেখে নিই [27] [28] –

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৮৫/ কুরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ
পরিচ্ছেদঃ ৩০৯৭. কোন বিষয় নবী (সাঃ) কর্তৃক অস্বীকৃতি জ্ঞাপন না করাই তা বৈধ হওয়ার প্রমাণ। অন্য কারো অস্বীকৃতি বৈধতার প্রমান নয়
৬৮৫৩। হাম্মাদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) … মুহাম্মদ ইবনু মুনকাদির (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) কে আল্লাহর কসম খেয়ে বলতে শুনেছি যে, ইবনু সায়িদ অবশ্যই (একটি) দাজ্জাল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহর কসম খেয়ে বলছেন? তিনি উত্তরে বললেনঃ আমি উমর (রাঃ) কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপস্থিতিতে কসম খেয়ে এ কথা বলতে শুনেছি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা অস্বীকার করেননি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির (রহঃ)

এই হাদিসটি থেকে সুস্পষ্ট যে, নবী যা হালাল করেছেন, এমনকি যা তিনি অবৈধ করেননি, অস্বীকৃতি জানাননি, তা পরবর্তী সময়ের যতবড় ইসলামের আলেমই হোক না কেন, সে তা অবৈধ বলার যোগ্যতা রাখে না। ইসলাম যদি দাসপ্রথাকে হালাল করে থাকে, পরবর্তীতে কোন মুসলিমের পক্ষে একে হারাম সাব্যস্ত করা বা অনৈতিক ও বেআইনি ঘোষণা করা অসম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *