পাহাড় পৃথিবীর পেরেক
ইসলামি বিশ্বাস অনুসারে আল্লাহ প্রথমে পৃথিবীতে জমিন বা মাটি সৃষ্টি করেছেন, এরপরে তার উপর স্থাপন করেছেন পর্বত। কোরআনে যেই শব্দটি রয়েছে সেটি হচ্ছে من فوقها যার অর্থ উপর থেকে। উল্লেখ্য, সমতলের ওপর দণ্ডায়মান কোন বস্তু উপর থেকে নিচের দিকে গেঁথে দেয়া বা গেড়ে দেয়া হতে পারে, আবার নিচ থেকে উপরে উঠে আসাও হতে পারে। যেমন গাছপালা হচ্ছে মাটির নিচ থেকে উপরে উঠে আসা বস্তু। আবার মেঝেতে পেরেক মারলে সেটি হয় উপর থেকে নিচের দিকে গেঁথে দেয়া বস্তু। আসুন আয়াতটির আরবি এবং বাঙলা অনুবাদ দেখি
وجعل فيها رواسي من فوقها
যমীন সৃষ্টির পর) তার বুকে তিনি সৃদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, যমীনকে বরকতমন্ডিত করেছেন আর তাতে প্রার্থীদের প্রয়োজন মুতাবেক নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য সঞ্চিত করেছেন চার দিনে।
— Taisirul Quran
তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে রেখেছেন কল্যাণ এবং চার দিনে ব্যবস্থা করেছেন খাদ্যের – সমভাবে, যাঞ্চাকারীদের জন্য।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তার উপরিভাগে তিনি দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং তাতে বরকত দিয়েছেন, আর তাতে চারদিনে প্রার্থীদের জন্য সমভাবে খাদ্য নিরূপণ করে দিয়েছেন।
— Rawai Al-bayan
আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে [১] এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন সমভাবে যাচঞাকারীদের জন্য।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
কোরআনে পাহাড় পর্বত সম্পর্কে আরো বলা আছে, পৃথিবী যেন নড়াচড়া না করে সেই কারণে আল্লাহ পাহাড় পর্বত দিয়ে পৃথিবীকে আটকে দিয়েছেন [47] –
তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ছাড়া যা তোমরা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন দৃঢ়ভাবে দন্ডায়মান পর্বতমালা যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে নড়াচড়া না করে আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সকল প্রকার জীবজন্তু, আর আমিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, অতঃপর তাতে উদ্গত করি যাবতীয় কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Taisirul Quran
তিনি আকাশমন্ডলী নির্মাণ করেছেন স্তম্ভ ব্যতীত, তোমরা এটা দেখছ। তিনিই পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পবর্তমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্ব প্রকার জীব-জন্তু এবং আমিই আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে এতে উদ্ভব করি সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ।
— Sheikh Mujibur Rahman
তিনি খুঁটি ছাড়া আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন, যা তোমরা দেখছ, আর যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পাহাড়, যাতে তা তোমাদেরকে নিয়ে হেলে না পড়ে, আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রত্যেক প্রকারের প্রাণী; আর আসমান থেকে আমি পানি পাঠাই। অতঃপর তাতে আমি জোড়ায় জোড়ায় কল্যাণকর উদ্ভিদ জন্মাই।
— Rawai Al-bayan
তিনি আসমানসমূহ নির্মাণ করেছেন খুঁটি ছাড়া—তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ; তিনিই যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরণের জীব-জন্তু। আর আমরা আকাশ হতে বারি বর্ষণ করি তারপর এতে উদ্গত করি সব ধরণের কল্যাণকর উদ্ভিদ। এই সম্পর্কে কোরআনে আরো বলা হয়েছে, পৃথিবীতে পাহাড় বা পর্বত হচ্ছে পেরেক সদৃশ। দেয়ালে কিছু আটকে রাখতে যেমন পেরেকের প্রয়োজন হয়, পৃথিবীকে আটকে রাখতেও আল্লাহ পেরেক অর্থাৎ উপর থেকে মেরে দিয়েছেন। কোরআনে পেরেকের উপমা দিয়ে বোঝানো হয়েছে, পাহাড় পর্বতগুলো উপর থেকে স্থাপিত।
আমি যে সব কিছুকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে সক্ষম তা তোমরা অস্বীকার করছ কীভাবে) আমি কি যমীনকে (তোমাদের জন্য) শয্যা বানাইনি?
— Taisirul Quran
আমি কি পৃথিবীকে শয্যা (রূপে) নির্মাণ করিনি?
— Sheikh Mujibur Rahman
আমি কি বানাইনি যমীনকে শয্যা?
— Rawai Al-bayan
আমরা কি করিনি যমীনকে শয্যা
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakariaআর পর্বতগুলোকে কীলক (বানাইনি)?
— Taisirul Quran
এবং পর্বতসমূহকে কীলক রূপে নির্মাণ করিনি?
— Sheikh Mujibur Rahman
আর পর্বতসমূহকে পেরেক?
— Rawai Al-bayan
আর পর্বতসমূহকে পেরেক ?
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakariaআধুনিক বিজ্ঞানের মতে, পৃথিবীর পৃষ্ঠের উপর পর্বতগুলি পেরেকের মত ‘উপর থেকে স্থাপিত’ হয়নি, বরঞ্চ নিচ থেকে উঠে এসেছে। পৃথিবীর দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ (যেমনঃ ভূমিকম্প) হলে একটি প্লেটের ভূত্বক উপরের দিকে যায় এবং অন্য প্লেটের ভূত্বক নিচের দিকে যায়। সেই সময়ে মাটির ভেতরে থাকা যে প্লেটটি উপরে চলে আসে তার দ্বারা একটি পর্বত তৈরি হয়।
টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংঘর্ষের এই প্রক্রিয়াটি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলতে থাকে এবং প্রতিটি সংঘর্ষের সাথে পর্বতগুলি ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে। এবং যখন টেকটোনিক প্লেটগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে, তখন এই উঁচু পর্বতগুলি ক্ষয় হতে শুরু করে এবং লক্ষ লক্ষ বছর পরে, তারা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, ২৫০ মিলিয়ন বছর আগে মাউন্ট এভারেস্ট বলে কিছু ছিল না। দুটি টেকটোনিক প্লেট একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং এর কারণে একটি ছোট মাউন্ট এভারেস্ট সৃষ্টি হয়। টেকটোনিক প্লেটের প্রতিটি সংঘর্ষে এটি উচ্চতা অর্জন করতে থাকে। বর্তমান সময়ে এটি সর্বোচ্চ পর্বত। এটি আরও উচ্চতা অর্জন করতে থাকবে, কিন্তু তারপর একটি সময় আসবে, যখন এটি ক্ষয় শুরু হবে এবং সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যাবে।
