পাশ্চাত্য দর্শন-সার : প্রাচীন যুগ

কবার বন্ধুদের এক আড্ডায় একজন বলে ওঠে সে মার্ক্স পড়তে চায়। সেটা শুনে আরেকজন বলল, মার্ক্স ডিরেক্ট করলে হবেনা, হেগেল না বুঝলে মার্ক্স বোঝা যাবেনা। তার দেখাদেখি আরেকজন বলে ওঠে, কান্ট না পড়লে হেগেল বোঝা যাবেনা। এরপর পড়ার তালিকায় উঠে এলো কান্ট, হিউম, লক, লাইবনিজ, স্পিনোজা, দেকার্ত হয়ে, মধ্যযুগে গিয়ে একুইনাস, ওকাম, স্কোটাসের স্কলাস্টিসিজম, মাঝখানে ইসলামী দর্শনের ইবনে রুশদ, বাজা হয়ে ফালাসিফার আল কিন্দি, আল ফারাবি, ইবনে সিনাও চলে এসেছিল, এরপর অগাস্টিনের প্রাচীন খ্রিস্টীয় দর্শন, নিওপ্লেটোনিজম, স্টোইসিজম, মিডল প্লেটোনিজম হয়ে স্কেপ্টিটিস্ট, এরিস্টোটল, প্লেটো, সক্রেটিস, সোফিস্ট হয়ে, অ্যাটোমিক, এলিয়াটিক, হয়ে মিলেটিকে গিয়ে পাশ্চাত্যের প্রথম দার্শনিক থেলিস… বিষয়টা ফানি হলেও, সত্য এটাই যে কোন কনসেপ্টগুলো বুঝতে গেলে এর পূর্বের ক্রমধারাটা না আলোচনা করে তা শুরু করা যায়না। কিন্তু সব কিছু পড়ার সময় থাকেনা, সেজন্যই ছোট করে নোট করা শুরু করি, যাতে অল্প সময়ের মধ্যেই পূর্ববর্তী দার্শনিক ধারাটা পড়ে ফেলে টারগেটেড ফিলোসফি বা কনসেপ্ট পাঠে হাত দেয়া যায়। তবে পরে দেখা গেল এই নোট পরে আরও অনেক কাজেই লাগছে। বিশেষ করে কোন দর্শনের ব্যাপারে ভুলে গেলে সহজেই ঝালিয়ে নেয়া, বা কেউ কোন দর্শনের ব্যাপারে আইডিয়া চাইলে এই নোট থেকেই কপি পেস্ট করে দিয়ে দেয়া। সংশয় ডট কমের আলোচনার পরিসরে ধর্মদর্শন, অধিবিদ্যা, নীতিবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনায় সম্পর্কিত দার্শনিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডি থাকলে পাঠকের তা বুঝতে সুবিধা হয়, তাছাড়া আলাদাভাবে দর্শন পড়ারও একটা গুরুত্ব রয়েছে। এই চিন্তা থেকে এখানে আমার বানানো এই নোটটি প্রকাশ করা হলো। ভবিষ্যতে এটি সংশোধিত-সম্প্রসারিত হতে পারে।

মিলেটিক স্কুল

থেলিস (খ্রি.পূ. ৬২৪-৫৪৬ অব্দ, মতান্তরে ৬৪০-৫৫০, ৬২৪-৫৪৭)

  • জীবনের সাথে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জল আছে ও জলের অভাবের সাথে প্রাণহীনতার সম্পর্ক আছে, তাই পরমসত্তা হল জল, জল থেকেই সব কিছুর উৎপত্তি, জলের মধ্যেই সব কিছু বিলীন হয়ে যায়।

অ্যানাক্সিমেন্ডার (খ্রি.পূ. ৬১১–৫৫৭ অব্দ)

  • অগ্নি, বায়ু, জল, মাটি এগুলো স্থুল বস্তু। এগুলোর যেকোন একটিকে পরমসত্তা বলা যায়না। (থেলিসের বিপরীতে)
  • জল বা আর্দ্রতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার বিপরীত সত্তা শুষ্কতাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিতে এই দুই বিপরীত সত্তার দ্বন্দ্ব কাজ করে, একটিকে আরেকটির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া যায়না, তাই একটিকে পরম সত্তা বলা যায়না।
  • পরমসত্তা এমন এক সূক্ষ্মবস্তু যা থেকে এই স্থুলবস্তুগুলোর উদ্ভব ঘটেছে। এই আদিসত্তা হলো সীমাহীন, অনন্ত, অসীম, অবর্ণনীয় বস্তু যার থেকে সব কিছুর জন্ম হয়, ও সব কিছু বিলীন হয়ে যায়। এটি আকারহীন, অনির্দিষ্ট ও সকল প্রকার বৈশিষ্ট্যবর্জিত, মানে এতে কোনরকম বৈশিষ্ট্য বা গুণ নেই। এর নাম ধরা হলো সীমাহীন বা বাউন্ডলেস।
  • সীমাহীন থেকে বিপরীত গুণগুলো যেমন পৃথক সত্তা লাভ করে, তেমনি সেই সব পৃথক বস্তু উপাদানগুলো আবার সীমাহীনে মিলিয়ে যায়।
  • সীমাহীন, স্বয়ম্ভূ, অর্থাৎ নিজে নিজের সৃষ্টি করেছে বা আপনা আপনি সৃষ্টি হয়েছে, কোন কিছু থেকে আসেনি।
  • বাউন্ডলেসের বিনাশ নেই, এর গতি বা পরিবর্তন অনন্ত। গতির কারণেই সীমাহীন থেকে বিশেষ বিশেষ বস্তুর পৃথকীকরণ সম্ভব হয়। জগৎ গঠিত হবার মূলে রয়েছে একটি বিষয়ের বিপরীত বা বিরুদ্ধ বিষয়ে বিভক্ত বা বিচ্ছিন্ন হবার প্রক্রিয়া।
  • অবিশেষ, অনির্দিষ্ট, আকারহীন প্রাথমিক উপাদান গতির কারণে কোন এক অনিশ্চিত প্রক্রিয়ায় নিজেকে উষ্ণ ও শীতল এই দুইয়ে বিভক্ত করে, এরপর শীতল পরিণত হয় আর্দ্র ও সেঁতসেঁতে। এই আর্দ্র জড় উপাদান বিশ্বজগতের কেন্দ্রস্থিত পৃথিবীর রূপ গ্রহণ করে। উষ্ণ জড় উপাদান পৃথিবী বেষ্টনকারী অগ্নিমণ্ডলে পরিণত হয়। তরল পৃথিবী চারপাশের উত্তাপে পৃথিবীর জল ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসের আবরণ সৃষ্টি করে পৃথিবীকে বেষ্টন করে। উত্তাপের প্রভাবে সেই বাষ্প বিস্তৃতি লাভ করে অগ্নিমণ্ডলের বাইরে গিয়ে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায় ও অসংখ্য চক্রাকৃতির খোসা রূপ গ্রহণ করে পৃথিবীর চারপাশে আবর্তিত হতে থাকে ও সূর্য, চন্দ্র, তারকা ইত্যাদি গ্রহ-নক্ষত্রে পরিণত হয়।
  • পৃথিবীতে সুনির্দিষ্ট পরিমাণে থাকা আগুন, জল ও মাটি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার অবিরাম প্রচেষ্টা চালায়, কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখার জন্য এক ধরণের অনিবার্য ও প্রাকৃতিক নিয়ম থাকায় যেখানে আগুন থাকে, সেখানে ভস্মও থাকে, যে ভস্ম হল পৃথিবী। ভারসাম্য বজায় রাখা ন্যায় বা জাস্টিস। অন্যদিকে একটি উপাদানের উপর অন্য উপাদানের অবৈধভাবে পদার্পন হলো অন্যায় (Injustice)। গ্রীষ্মকালে উষ্ণ উপাদান ও শীতকালে শীতল উপাদানের ইনজাস্টিস দেখা যায়। বাউন্ডলেসের মধ্যে মিশে গিয়ে এই বিশেষ উপাদানগুলোর ইনজাস্টিসের ক্ষতিপূরণ হয়।

অ্যানাক্সিমিনিস (খ্রি.পূ. ৫৮৮-৫২৪ অব্দ)

  • বিমূর্ত ও অবিশেষ কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই। আদিম তত্ত্ব তাই বিমূর্ত ও অবিশেষ হতে পারেনা, একে মূর্ত ও বস্তুজগতের বিষয় হতে হবে। (অ্যানাক্সিমেন্ডারের বিপরীতে)
  • অ্যানাক্সিমেন্ডার যেমন বলেছেন তেমনিভাবে আবার আদিম তত্ত্বকে সীমাহীন হতে হবে ও তার গতি নিরবিচ্ছিন্ন হতে হবে। গতিশীল ক্ষমতা বায়ুর অন্তর্নিহিত ক্ষমতা। তাই গতির দ্বারাই তার মতে বায়ু থেকে জগতের উৎপত্তি হয়েছে।
  • মানুষ বায়ু বা শ্বাস ছাড়া বাঁচেনা, বায়ু তাই আমাদের আত্মা হিসেবে আমাদের ধরে রাখে। একইভাবে বায়ু পৃথিবীর শ্বাস হিসেবে কাজ করে পৃথিবীকে ধরে রাখে। জগৎ জগতের বাইরের সীমাহীন পুঞ্জ বা বাউন্ডলেস মাস থেকে শ্বাস বা বায়ু গ্রহণ করছে। তাই এটি মূল উপাদান।
  • সব মিলিয়ে কেবল বায়ু এই ক্রাইটেরিয়াগুলো পুরণ করতে পারে, তাই আদিমতত্ত্ব বায়ু।
  • বায়ু থেকেই অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব বস্তুর উদ্ভব হয়েছে। অন্যান্য সব কিছু বায়ু থেকে তৈরি বস্তু থেকেই উৎপন্ন।
  • ঘনীভবন (condensation) ও সংকোচন (Rarefaction) এই দুটি প্রক্রিয়ায় বায়ু থেকে জগতের উদ্ভব হয়। প্রথমটি উষ্ণ হওয়া ও দ্বিতীয়টি শীতল হওয়া নির্দেশ করে। বায়ু সংকোচন হলে অগ্নির সৃষ্টি হয়, আগুন হল হালকা বায়ু। আবার বায়ু ঘনীভূত হলে প্রথমে জল, পরে মাটি ও আরও ঘনীভূত হলে পাথরে পরিণত হয়।
  • যথাসময়ে জগৎ তার আদিম উপাদান বায়ুতে প্রত্যাবর্তন করবে।
  • জগৎগুলো ধারাবাহিক, এক জগতের শেষের পর আরেক জগতের উৎপত্তি হবে, আর এভাবে জগতের সংখ্যা হবে অনন্ত ও অসীম। তবে তিনি ধারাবাহিক না হয়ে সমকালীন একাধিক জগৎ বোঝাতে পারেন।
  • অ্যানাক্সিমিনিস মনে করতেন সৃষ্টি প্রক্রিয়ার শুরুতেই পৃথিবীর উৎপত্তি হয়, আর এটি একটি সমতল গোলাকার থালার মত, যা বাতাসের উপর ভাসমান। গ্রহ নক্ষত্রগুলোও বাতাসের উপরেই ভাসছে। সমতল পৃথিবীকে বায়ুই উপরে ধরে রেখেছে। এর থেকে উত্থিত বাষ্প সংকুচিত হয়ে আগুনে পরিণত হয়, যার অংশবিশেষ বাতাসের চাপে তারায় পরিণত হয়। এগুলোর আকার পৃথিবীর আকারের মত আর বাতাসের উপর ভেসে ভেসে পৃথিবীকে আবর্তিত হয়ে আছে।

পিথাগোরাস (খ্রি.পূ. ৫৬২ – ৪৯৩ অব্দ) পিথাগোরিয়ান স্কুল

  • অনুপাত, শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্যকে ভিত্তি করে এই বিশ্বজগৎ দাঁড়িয়ে আছে যার মধ্যে গভীর সংযোগ রয়েছে, যেগুলোকে সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা যায়। সংখ্যা ছাড়া প্রকৃতির শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যা করা যায় না। নির্ধারিত মাত্রা বা পরিমাণ কম-বেশী হলে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হতাে। জগতের এই মাত্রা বা পরিমাণ সংখ্যা দ্বারাই ব্যাখ্যা করা যায়। তাই সংখ্যাই বস্তু। (মিলেটিক স্কুলের বিপরীতে)
  • সংখ্যাহীন জগতের কথা আমরা কখনও ভাবতে পারি না। তাই সংখ্যাই হল জগতের মূল উপাদান।
  • পিথাগোরীয় দর্শনে অদ্বৈতবাদ ও দ্বৈতবাদের পরষ্পরবিরোধিতা দেখা যায় –
  • অদ্বৈতবাদী পিথাগোরিয়ানিজম : এক্ষেত্রে সব কিছু সংখ্যা থেকেই উদ্ভুত
    • সংখ্যার উপাদান হল যুগ্ম বা জোড় ও অযুগ্ম বা বিজোড়। এদের মধ্যে জোড় হচ্ছে অসীম, আর বিজোড় হচ্ছে সসীম। এর মধ্যে ১ সংখ্যাটি অসীম ও সসীম উভয় থেকেই উদ্ভূত কারণ এটি জোড় ও বিজোড় উভয়ই। এই ১ সংখ্যা থেকেই সব সংখ্যা ও সমগ্র বিশ্বজগতের উদ্ভব।
    • সঙ্গীতের মধ্যকার সঙ্গতিকে গাণিতিক সূত্র দিয়ে প্রকাশ করা যায়, কারণ বাদ্যযন্ত্রে বিভিন্ন সুর বাজানোর সময় সুরগুলোর পার্থক্য নির্দিষ্ট সময়ে কম্পন সংখ্যা বা কম্পাঙ্কের পার্থক্য। সঙ্গীতে যেবিরাম বা মিউজিকাল ইন্টারভালের ব্যাপারটিও সংখ্যাগত অনুপাতের উপরে নির্ভর করে। এভাবে নির্দিষ্ট গাণিতিক অনুপাতের দ্বারা মিউজিকাল হারমোনি বা সঙ্গীতের সঙ্গতি নির্ধারিত হয়। এই বিশ্বজগতের সঙ্গতিই একধরণের সঙ্গীতের সঙ্গতি, তাই সঙ্গীতের সঙ্গতির মত বিশ্বজগতের সঙ্গতিকেও সংখ্যার সাহায্যে প্রকাশ করা যায়। তাই জগতের মূলতত্ত্ব হল সংখ্যা, সংখ্যার থেকেই সব কিছুর সৃষ্টি।
    • ১ হল বিন্দু, ২ হল রেখা, ৩ হল তল বা সারফেস, ৪ হল ঘন। তাই যখন বলা হয় সব কিছুই সংখ্যা, তখন এর অর্থ হচ্ছে সব বস্তুই স্থানে অবস্থিত বিন্দু বা এককের (units) দ্বারা গঠিত, যেগুলোকে সংযুক্ত করলে একটি সংখ্যা গঠিত হয়। এই বিন্দু, রেখা, তল ও ঘন নির্দেশক চারটি সংখ্যার যোগফল (১+২+৩+৪) বা ১০ সংখ্যাটি পবিত্র। নিচ থেকে উপরে এগুলোকে বিন্যাস করে, অর্থাৎ নিচে ৪টি বিন্দু, তার উপর ৩টি, তার উপর ২টি ও তার উপর ১টি বিন্দুকে সাহিয়ে যে পিরামিডের আকার তৈরি হয় তাও পবিত্র। এভাবে সংখ্যা জ্যামিতির সাথে সম্পর্কিত। আর জ্যামিতির সাথে জড়ের গঠনের সম্পর্ক রয়েছে। এভাবে সংখ্যার ধারণা প্রয়োগ করে জড় সত্তার বিন্যাসের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়। কয়েকটি বিন্দুকে পাশাপাশি রাখলে রেখা, কয়েকটি রেখাকে পাশাপাশি রাখলে তল, কয়েকটি তলকে পাশাপাশি রাখলে একটি বস্তুর সৃষ্টি হয়। তাই বিন্দু, রেখা, তল এসব বাস্তব একক, কাল্পনিক নয়, যার দ্বারা সব প্রাকৃতিক বস্তু গঠিত। এভাবে সব বস্তু হল সংখ্যা। তিনটি মৌলিক উপাদান বিন্দু, রেখা ও তল থেকে চতুর্থ পদ রূপে প্রতিটি জড়ের উদ্ভব বলে প্রতিটি জড় এই ৪ সংখ্যাটির প্রকাশ।
  • দ্বৈতবাদী পিথাগোরিয়ানিজম : এক্ষেত্রে সংখ্যা ছাড়াও জড়ের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়
    • সংখ্যা অ্যানাক্সিমেন্ডারের সীমাহীনে সীমা আরোপ করে তাকে আকার বা রূপ বা ফর্ম দান করে। সঙ্গীতে যেমন সংখ্যার অনুপাত বা নিয়ম আওয়াজকে রূপদানের মাধ্যমে সঙ্গীতের সৃষ্টি করে, তেমনি সংখ্যার অনুপাত বা নিয়ম সীমাহীনকে রূপদান করে বিশ্বজগতের সঙ্গতি তৈরি করে, তাই সংখ্যা সীমা বা লিমিট হিসেবে কাজ করে।
    • বস্তুগুলো হল সংখ্যা। সংখ্যা থেকে সব কিছু তৈরি হয়েছে। এই সংখ্যা জড় বস্তু নয়, এটা অতীন্দ্রীয় বা সুপারসেন্সুয়াল। সংখ্যা থেলিসের জল, অ্যানাক্সিমেন্ডারের সীমাহীন ও অ্যানাক্সিমিনিসের বায়ু সহ যেকোন রকমের জড় থেকে আলাদা। কিন্তু এটি জড়কে সীমিত করে তাকে রূপ বা আকার প্রদান করে। তাই এক্ষেত্রে পিথাগোরীয়রা সংখ্যাকে মূল উপাদান বললেও জড় যে পূর্ব থেকেই আছে তাকেও স্বীকার করে নেয়।

এলিয়াটিক স্কুল

জেনােফ্যানিস (আনু. ৫৭০-৪৭৮ খ্রিঃপূঃ)

  • সকল কিছুর ঐক্য রয়েছে, সবকিছু এক, এই এক হলো ঈশ্বর।
  • ঈশ্বর জগতের অতিবর্তী নন, জগতের সঙ্গে আঙ্গিক সম্পর্কে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। ঈশ্বর জগতবহির্ভূত সত্তারূপে জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করেননা, অর্থাৎ অতিবর্তী ঈশ্বরবাদ মিথ্যা, ঈশ্বর ও জগত অভিন্ন, জগৎ ঈশ্বরেরই প্রকাশ। সবকিছুই ‘এক’ (all is one)’ এবং ‘এক’ ছাড়া অন্য কোন কিছুর বাস্তবতা নেই, সমগ্র জগৎ-সংসার এক ঈশ্বরেরই প্রকাশ। এটি সর্বেশ্বরবাদ
  • ঈশ্বর এক ও অপরিণামী নিত্যসত্তা, অর্থাৎ ঈশ্বরের কোন গতি বা পরিবর্তন নেই। তিনি নিশ্চল, এক জায়গায় অবস্থান করেন। গতি ঈশ্বরের একত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তাই ঈশ্বর অনড়। তবে সমগ্র হিসেবে গতিহীন হলেও তার অংশগুলােতে গতি ও পরিবর্তন রয়েছে। ঈশ্বর অপরিণামী ও অপরিবর্তনশীল বলে এর থেকে কোন কিছু উৎপন্ন হয়না, ঈশ্বর কোন কিছু সৃষ্টি করেননা, বরং যা কিছু দেখা যায় সবই ঈশ্বরেরই প্রকাশ।
  • ঈশ্বর অনন্ত, তার শুরু বা শেষ নেই। তার পাশে কিছুই নেই। এদিক থেকে তিনি অসীম। আবার তিনি পূর্ণ ও নিখুঁত আকারবিশেষ, তাই তিনি সসীম, নিরাকার অসীম নন।
  • একক সত্তা হিসেবে ঈশ্বর অনাদি ও অবিনশ্বর, তার উৎপত্তি ও বিনাশ নেই। একক হলাে এমন সত্তা যা অদ্বিতীয়। তাই অন্য কোন সত্তা তার সমসাময়িক থাকা সম্ভব নয়। তাই অন্য কোন সত্তা দ্বারা একক ঈশ্বরের সৃষ্টি হওয়ার সুযােগ নেই। আবার ঈশ্বরের মধ্যে যা আছে তা দিয়ে ঈশ্বর সৃষ্টি হয় — এমন ধারণা হাস্যকর। তাই ঈশ্বর অনাদি। তার ধ্বংস কল্পনা করা চলে না। কেননা ধ্বংস করার মতাে তার থেকে কোন উচ্চতর সত্তা নেই।
  • জগৎ হলাে ইন্দ্রিয়হীন এক সচেতন সত্তা ঈশ্বর। তবে ইন্দ্রীয় না থাকলেও তিনি সবকিছু দেখেন, সমগ্রকে অনুভব করেন, সবকিছু শােনেন।
  • আত্মা, পরকাল, পাপ-পুণ্য ইত্যাদির অস্তিত্ব আছে। ঈশ্বরভক্তি স্বীকার্য। জগতের ঐক্য, এবং ঈশ্বর ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্যতার ধারণার ওপর তার ধর্মতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত।
  • ঈশ্বরের ইচ্ছায় এগুলো সহ জগতের সবকিছু হয়। তিনি কেবল ইচ্ছা করলেই সবকিছু হয়ে যায়। তার তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্য স্থাপনে এটি বলা যায়, ঈশ্বরের ইচ্ছা তার চৈতন্যের অংশ, যার ফলে তিনি নিজে অপরিণামী ও অপরিবর্তনীয় হলেও তার অংশ হিসেবে জগতে পরিবর্তন হচ্ছে আর তার মাধ্যমেই জগতের বিভিন্ন বিষয়ের সৃষ্টি হচ্ছে, যার মধ্যে প্রাণীজগৎ রয়েছে।
  • পাথরে সামুদ্রিক দ্রব্যের নমুনা থেকে অনুমান করা যায়, মানুষসহ সকল প্রাণী মাটি ও জল থেকে উদ্ভূত। জগতের প্রাথমিক পর্যায় সমুদ্র, সমুদ্রাবস্থা থেকে ক্রমশ বিশ্ব এই অবস্থা ধারণ করেছে। অতীতের কোনাে একসময় পৃথিবী সমুদ্রের সাথে যুক্ত ছিল। কালক্রমে তা পৃথক হয়ে যায়। ভবিষ্যতের কোনাে একসময় জগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে ও পৃথিবী পুনরায় সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে কাদায় পরিণত হবে। কিন্তু আবারও সমুদ্র থেকে জগৎ জেগে উঠবে। সৃষ্টি হবে মানুষসহ সকল প্রকার জীব-জন্তু-উদ্ভিদ। আবার নতুন করে মনুষ্যজাতির সৃষ্টি হবে।
  • সূর্য একটি জ্বলন্ত বাষ্পকুন্ডলী, বিভিন্ন আগ্নেয় কণিকার সমবায়ে রােজ রােজ সূর্য গঠিত হচ্ছে। এটা সরল রেখায় চলে। সারাদিন চলতে চলতে এটা সন্ধ্যাবেলা বায়ুতে মিশে নিঃশেষ হয়ে যায়, অর্থাৎ বায়ু হয়ে যায়। পরের দিন আবার একটি নতুন সূর্য ওঠে। এভাবে সূর্যের সৃষ্টি ও বিনাস প্রক্রিয়া চলতে থাকে। অর্থাৎ একই সূর্য প্রতিদিনই প্রাতঃকালে উদিত হয় না। সমুদ্রের বাষ্প থেকে নিত্যই একটি করে নতুন সূর্য তৈরি হয়। অর্থাৎ সূর্য, নক্ষত্র প্রভৃতি ঐশ্বরিক বস্তু নয়, বরং নশ্বর বস্তু ও ক্ষণস্থায়ী। উত্তপ্ত মেঘ থেকে নক্ষত্রপুঞ্জের উৎপত্তি। দিনের বেলায় এরা নিভে যায় এবং রাতের বেলায় পুনরায় প্রজ্বলিত হয়। তাদের উদয় ও অস্ত বলতে এভাবে প্রজ্বলিত ও নির্বাপিত হওয়াকে বোঝায়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সূর্য রয়েছে।

পারমিনাইডিস (৫১৪-? খ্রিঃপূঃ)

  • জগতের সব কিছু ক্ষণস্থায়ী ও পরিবর্তনশীল বলে কোন কিছু সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায়না। কেবল স্থায়ী বিষয়ের যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায়।
  • যে বিষয়টি চিন্তা করা যায় বা জ্ঞান লাভ করা যায়, তার অস্তিত্ব আছে বলেই তা চিন্তা করা সম্ভব হচ্ছে। একমাত্র অস্তিত্বশীল কোন কিছুই তা নিয়ে চিন্তা করার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ কেবলমাত্র অস্তিত্বশীল কিছু সম্পর্কেই আত্মায় জ্ঞানের উন্মেষ ঘটতে পারে। যা অস্তিত্বশীল নয়, অর্থাৎ শূন্যতা সেই বিষয়ে কোন চিন্তার উদ্ভব বা জ্ঞানের উন্মেষ সম্ভব নয়। তা আমরা যা নিয়েই চিন্তা করি বা করতে পারি তাই অস্তিত্বশীল। এক্ষেত্রে চিন্তনকে সংগতিপূর্ণ হতে হবে, স্ববিরোধীদোষে দুষ্ট চিন্তন চিন্তন নয়।
  • যা চিন্তা করা যায় তাই সত্তা, অর্থাৎ কেবলমাত্র সত্তারই যথার্থ অস্তিত্ব আছে, অর্থাৎ সত্তাই (Being) একমাত্র তত্ত্ব। সত্তা হল এক, সত্তা অস্তিত্বশীল। সত্তার প্রকৃতি যাই হােক না কেন, সত্তা আছে, সত্তা অস্তিত্বশীল, এর পক্ষে অস্তিত্বশীল না হওয়া অসম্ভব, কেননা এটি নিয়ে চিন্তা করা যায়। সত্তার সম্পর্কে প্রথম কথাই হল ‘এটি আছে’ (It is)। এখানে সত্তা সব অস্তিত্বশীল কিছুর সার্বিক নয়, বরং এটাই একমাত্র অস্তিত্বশীল বিষয়, যা কিছু আছে সবই সত্তার প্রকাশ। অস্তিত্বই সত্তার একমাত্র ভাববাচক বৈশিষ্ট্য, তাই সত্তা নির্গুণ। সত্তা ছাড়া কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই বলে সত্তা অনির্ভরশীল।
  • অ-সত্তা সত্তার বিপরীত, অস্তিত্বশীল কোন কিছুর অর্থই যদি সত্তা হয়, তাহলে অ-সত্তা মানে হলো শূন্যতা, যার কোন অস্তিত্ব নেই বা ‘কোন কিছু নয়’। সত্তার পরিণাম বা পরিবর্তন নেই। এটির জ্ঞান লাভ করা যায়না। তাই পরিবর্তন বলতে কিছু থাকতে পারেনা, তা অলীক বা মিথ্যা। যেহেতু চিন্তা করা যায় এমন বস্তু মাত্রই অস্তিত্বশীল তাই ধরে নিতে হবে যে পরিণাম বা পরিবর্তনশীলতা নিয়ে আমরা যে চিন্তা করি সেই চিন্তাটাই আসলে ভুল চিন্তা। পরিণাম নেই বলে সত্তা স্থির বা অচল। সচল হলে শূন্য দেশে সত্তাকে চলাচল করতে হতো, কিন্তু শূন্য দেশ নিজেই অ-সত্তা।
  • আমরা জগতের যে পরিবর্তন দেখি তা ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য। কিন্তু পরিবর্তন অ-সত্তা, তাই ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য বিষয়মাত্রই অ-সত্তা। অর্থাৎ আমরা যা দেখি তা আসলে অস্তিত্বহীন, অবভাস। কেবলমাত্র সত্তা, যা এক, অবিভাজ্য, অপরিণামী, তাই অস্তিত্বশীল। বিচারবুদ্ধির সাহায্যে সত্তাকে জানতে হয়। ইন্দ্রিয় ও বিচারবুদ্ধির পার্থক্য আছে। ইন্দ্রিয় মিথ্যা, অলীকতা, অবভাসের উৎস। সত্যতা কেবল বিচারবুদ্ধিতে। (জেনোফ্যানিসের বিপরীতে)
  • মানুষের বিচারবুদ্ধির সত্তাকে জানার ক্ষমতা আছে। মানুষ বিচারবুদ্ধির সাহায্যে, যে সঙ্গতিপূর্ণ চিন্তা করতে পারে তাই অস্তিত্বশীল হয়।
  • উৎপত্তি বা বিনাশ হলো একরকম পরিণাম, সত্তার সেগুলোও নেই। সত্তার উৎপত্তি আছে – বক্তব্যের অর্থ সত্তা হয় সত্তা থেকে উৎপন্ন হয়েছে বা অ-সত্তা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। সত্তা যদি সত্তা থেকে উৎপন্ন হয় তাহলে সত্তা উৎপন্ন হয়েছে একথা বলা যাবে না, কেননা সেক্ষেত্রে সত্তা পূর্ব থেকেই অস্তিত্বশীল, আর যা অস্তিত্বশীল তাই সত্তা। আর সত্তা অসত্তা থেকে উদ্ভূত হলে অ-সত্তাকে অস্তিত্বশীল কিছু বলে স্বীকার করে নিতে হয়, যা হতে পারেনা। অর্থাৎ অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বের সৃষ্টি হতে পারেনা, তাই সত্তা সবসময়ই অস্তিত্বশীল, অর্থাৎ সত্তা নিত্য।
  • সত্তা অপরিণামী বলে সত্তার সম্পর্কে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কথা বলা চলে না। এ হল এক অনাদি কালহীন বর্তমান (Eternal Timeless Present)।
  • সত্তা হল পরিপূর্ণ অখণ্ড সত্তা, এটি এক ও অবিভাজ্য। অবিভাজ্য বলে সত্তা নিরবচ্ছিন্ন।
  • সত্তার আদি অন্ত নেই বলে সত্তাকে অসীম ধরা যায়, কিন্তু দৈশিক দিক দিয়ে সত্তা সসীম, অর্থাৎ সব দিক দিয়েই সত্তা সমানভাবে অস্তিত্বশীল। সত্তা অসীম হলে তা নির্বিশেষ বা অনির্দিষ্ট হতো, কিন্তু সত্তা বাস্তব বলে নির্বিশেষ বা অনির্দিষ্ট হতে পারেনা। সত্তা সুনির্দিষ্ট, সবিশেষ ও পরিপূর্ণ। আর দৈশিক দিক দিয়ে সত্তা সমানভাবে অস্তিত্বশীল হওয়ায় সত্তা আকারের দিক দিয়ে গোলকাকার, যা কেন্দ্র থেকে সকল দিকে সমানভাবে নিরবিচ্ছিন্নভাবে অবস্থিত, কোন স্থানে কম-বেশি হতে পারেনা।

জেনো (৪৯৫-৪৩০ খ্রি.পূ.)

  • চিন্তাযোগ্য বিষয়ই অস্তিত্বশীল, এবং তা-ই সত্তা। কিন্তু চিন্তন কোন দোষে দুষ্ট হলে সেই চিন্তন অস্তিত্বশীল নয়। একক, অবিভাজ্য, ও অচল সত্তার অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বহুত্ব, শূন্য দেশ ও গতির অলীকতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, যেখানে বহুত্ব ঐক্য ও অবিভাজ্যতা-বিরোধী, শূন্য দেশ ও গতি অচলতা বিরোধী। (পারমিনাইডিস প্রভাবিত)
  • সত্তা এক ও অবিভাজ্য। সত্তা অনেক ও বিভাজ্য হলে সত্তাকে বহু বা বহুত্ব-চিন্তনের যোগ্য ধরতে হয়। কিন্তু এই বহুত্ব আসলে অলীক বা অসত্তা, কেননা বহুত্বের চিন্তন স্ববিরোধী দোষে দুষ্ট। কোন বহু অনেক একক দ্বারা গঠিত হবে। যদি ধরে নেই এককগুলোর একটি নির্দিষ্ট বিস্তার আছে তাহলে সেই বহু একক দ্বারা অন্তহীনভাবে বিভাজ্য হওয়ায় ও প্রতিটি এককের একটি বিস্তৃতি থাকায় সেই বহুর বিস্তার অসীম হবে, যা কখনও হতে পারেনা। আবার যদি বহুকে গঠন করা একককে বিস্তৃতিহীন ধরি তাহলে সেই এককের দ্বারা গঠিত বহুও বিস্তৃতিহীন হবে, তাহলে সেই বহু হবে অসীমতক ক্ষুদ্র, যা কখনও হতে পারেনা। তাই বহুত্বের চিন্তন স্ববিরোধী দোষে দুষ্ট হওয়ায় বহুত্ব অলীক। তাই সত্তা অবশ্যই এক ও অবিভাজ্য। বহুকে সবসময় গণনা করা যায় তাই তা অস্তিত্বশীল, গণনা করা যায়না এমন অনির্দিষ্ট কোন কিছু অস্তিত্বশীল হতে পারেনা, তাই বহু সসীম। আবার কোন বহু অন্তহীনভাবে বিভাজ্য হতে পারে তাই বহু অসীম। কিন্তু অসীম ও সসীম বিপরীতার্থক বলে একই সাথে একটি বিষয়ে সসীমত্ব ও অসীমত্বকে আরোপ করা যায়না। তাই বহুত্বের চিন্তন স্ববিরোধী দোষে দুষ্ট হওয়ায় বহুত্ব অলীক। তাই সত্তা অবশ্যই এক ও অবিভাজ্য।
  • সত্তা অচল ও স্থির। সত্তা অচল ও স্থির না হলে তাকে অস্তিত্বশীল শূন্য দেশেই চলাচল করতে হবে। কিন্তু শূন্য দেশের অস্তিত্ব থাকতে পারেনা, তা অলীক বা অ-সত্তা। যদি বস্তু কোন দেশ বা স্থানে থাকে, তাহলে সেই দেশ বা স্থানকেও কোন দেশ বা স্থানে থাকতে হবে, এভাবে অনবস্থা দোষ হবে, তাই শূন্য দেশের চিন্তন ভুল, তাই এটি অলীক বা অ-সত্তা, তাই সত্তার গতিশীলতাও অলীক, তাই সত্তা অচল ও স্থির।
  • সত্তার গতি বা পরিণাম নেই। গতির চিন্তন অলীক। কোন দূরত্ব অতিক্রম করতে হলে প্রথমে সেই দূরত্বের অর্ধেক অতিক্রম করতে হবে। অবশিষ্ট অর্ধেক দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য বাকী থাকবে। তারপর অবশিষ্ট এই অর্ধেক দূরত্বের অর্ধেক অতিক্রম করতে হবে, আবার অর্ধেক অবশিষ্ট থাকবে। তার মানে সীমিত সময়ে অন্তহীন সংখ্যক দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে, যা অসম্ভব। একিলিস এবং কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতা কচ্ছপকে যদি একিলিস কিছুটা দূরত্বে এগিয়ে দৌড় শুরু করতে দেয়, এবং তারপর যদি একিলিস দৌড়াতে শুরু করে তাহলে যেখান থেকে কচ্ছপ যাত্রা শুরু করছে সেই জায়গায় গিয়ে যখন একিলিস পৌছাবে, তখন কচ্ছপ আরও এগিয়ে গেছে অন্য একটি স্থানে, আবার সেখানে যখন একিলিস গিয়ে পৌঁছাবে, তখন কচ্ছপ অপর একটি স্থানে গিয়ে পোঁছবে, এইভাবে একিলিস ক্রমশ কচ্ছপের কাছাকাছি দূরত্বে এসে যাবে কিন্তু কখনও তাকে অতিক্রম করে যেতে পারবে না। আরও পারবে না এই কারণে যে, একটি রেখা অনন্ত সংখ্যক বিন্দুর দ্বারা গঠিত এবং একিলিসকে অসীম দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু এটা অবাস্তব। তাই গতি অলীক। তাই সত্তার গতি বা পরিণাম নেই।
  • কোন বস্তু একটি মুহূর্তে দুটি স্থানে অবস্থান করতে পারে না, এবং কোন একটি স্থানে অবস্থান করার অর্থ স্থির থাকা। নিক্ষিপ্ত তীর যে কোন মুহূর্তে নিজের দৈর্ঘ্যের সমান দেশে অবস্থান করবে এবং সে কারণে এটি স্থির থাকবে। অনন্ত সংখ্যক স্থিরতার অবস্থানের যোগফল কখনও গতি হতে পারে না। তাই নিক্ষিপ্ত তীরটি স্থির থাকে, গতিশীল থাকেনা। তাই তীরের গতিশীলতার কল্পনা অলীক বা মিথ্যা বা অ-সত্তা। তাই সত্তার গতি থাকতে পারেনা।

হেরাক্লিটাস (৫৩৫-৪৭৫ খ্রী.পূ.)

  • বস্তুর নিরন্তর পরিবর্তন, বিশেষ বস্তুর অস্থায়িত্ব নির্দেশ করে বিশ্বজগতকে সদা পরিবর্তনশীল এবং নিত্যনতুন পরিণামের অধীন। সকল কিছুই নিরন্তর পরিবর্তিত হচ্ছে, পুরাতন রূপ এবং আকার পরিত্যাগ করে নতুন রূপ এবং আকার পরিগ্রহ করছে। কোন কিছুই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। গতি ও পরিবর্তনই বিশ্বের ধর্ম, সকল কিছুই গতিশীল, স্রোতের মত প্রবাহমান এবং নিরন্তর পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনের অর্থ হল একটি অবস্থার পর আর একটি অবস্থার উদ্ভব। জগতের যাবতীয় বস্তু সদা পরিণামী। এক নদীতে কেউ দুবার অবগাহন করতে পারে না, কেননা প্রথমবার অবগাহন করার পর নদী পরিবর্তিত হয়ে গেছে, নতুন জলের স্রোত প্রবাহমান। কোন মুহূর্তেই পূর্ববর্তী মুহুর্তের নদীর জলের সঙ্গে তার পরবর্তী মুহূর্তের জলের কোন সাদৃশ্য নেই। এ জগতে কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। (এলিয়াটিক স্কুলেরবিপরীতে)
  • বস্তুর আপেক্ষিক স্থায়ীত্বের বিষয়টি অলীক। সব কিছুই মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে কোন কিছু এক মুহূর্ত থেকে অন্য মুহূর্তে অপরিবর্তিত থাকছে না। আমরা মনে করি, কোন একটি বস্তু অনেক মুহূর্ত ধরে অপরিবর্তিত থাকছে, কিন্তু বস্তুর এই ধরনের আপেক্ষিক স্থায়ীত্বের বিষয়টি ভ্রম প্রত্যক্ষ। জলের উপরিভাগ দিয়ে যে ঢেউ বয়ে যায় আপাতদৃষ্টিতে তাকে এক ঢেউ বলেই মনে হয়। কিন্তু আসলে ঢেউটি এক নয়, কেননা যে জল দিয়ে ঢেউটি তৈরি সেটি মুহুর্তে মুহুর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে। বস্তুর মধ্যে সমপরিমাণ দ্রব্যের প্রবেশ ও নির্গমনই বস্তুর স্থায়ীত্বের ভাব মনে জাগিয়ে তােলে। এক সূর্য রােজ উদিত হচ্ছে বা অস্ত যাচ্ছে তা নয়, রােজই এক নতুন সূর্যের আবির্ভাব ঘটছে। কেননা সূর্যের অগ্নি নিজেকে দগ্ধ করে নিঃশেষিত করলেও সমুদ্রের বাষ্প থেকে তার ক্ষয়পূরণ হয়ে যাচ্ছে। (এলিয়াটিক স্কুলেরবিপরীতে)
  • বস্তু যে শুধু মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে তা নয়, এক মুহূর্তও তারা এক অভিন্ন বস্তু থাকছে না। একটি বস্তু প্রথম মুহূর্তে এক রয়েছে, তার পরের মুহূর্তে অন্য কিছুতে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা নয়, একই সময়ে এটি আছে এবং নেই এই কথাই সত্য। ভবন (Becoming)-এর অর্থই হচ্ছে তাই একই সঙ্গে থাকা আর না থাকা। তাই সত্তা এবং অ-সত্তা উভয়ই সত্য। কারণ আসলে উভয়ে এক পথ নয়। ভবন হল সত্তা এবং অ-সত্তার অভেদ। ভবন হল বস্তুর উৎপত্তি এবং তাদের তিরােধান, তাদের শুরু এবং তাদের শেষ, তাদের উৎপত্তি এবং তাদের ধ্বংস। উৎপত্তি হল অ-সত্তার সত্তায় পরিণতি, ধ্বংস হল সত্তার অ-সত্তায় পরিণতি। কাজেই ভবন হল সত্তা ও অসত্তা এই দুই উপাদানের একটির আর একটিতে পরিণতি। সত্তা এবং অসত্তা একই সময়ে সব কিছুতে বর্তমান। ‘সত্তাই অ-সত্তা’, সত্তাতেই অ-সত্তা রয়েছে। জীবনের মধ্যেই প্রচ্ছন্নভাবে রয়েছে মৃত্যু। তাই বস্তু আছে আবার নেই।
  • বিজ্ঞতা বহু বিষয়ের জ্ঞান নয়, কেবলমাত্র একটি বিষয়ের সুস্পষ্ট জ্ঞান। এই একটি বিষয় হলো এই যে, সত্তা ‘এক’ এবং এই এক সত্তা বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য, ভেদের মধ্যে অভেদ।
  • শুধু সত্তার মধ্যেই যে অ-সত্তা রয়েছে তা নয়, জগতের প্রতিটি বস্তুর মধ্যে রয়েছে তার যা বিরোধের অস্তিত্ব, প্রতিটি অস্তিত্বশীল বস্তু হল বিরােধী টানের এক ভারসাম্য। বিরােধী শক্তির সংঘাত বিশ্বের সর্বত্রই দ্রষ্টব্য। বস্তুত প্রতিটি বস্তুর মধ্যেই নিহিত রয়েছে তার বিরােধী নীতি। এই পরস্পরবিরােধী নীতির সংঘাতের মধ্যেই বস্তুর অস্তিত্ব, বস্তুর সত্তা নিহিত। প্রতিটি বস্তুর অন্তরে রয়েছে সংঘাত। বস্তুর মধ্যে যদি এই সংঘাত না থাকলে বস্তু ধ্বংস হয়ে যেত। বিরােধীসংঘাত একের অস্তিত্বের জন্য অনিবার্যভাবে প্রয়ােজন। সংঘাতই সব কিছুর জনক। ঈশ্বর হলেন দিন এবং রাত্রি, গ্রীষ্ম এবং শীত, যুদ্ধ এবং শান্তি, ক্ষুধা এবং পরিতৃপ্তি।
  • সত্তা হল এক এবং এই একের অস্তিত্বের জন্য বিরুদ্ধধর্মী পদার্থের সংঘাত অবশ্যই প্রয়ােজন। আমরা অবশ্যই জানব যে যুদ্ধ সকল ক্ষেত্রেই বর্তমান এবং বিরােধ বা সংঘাতই ন্যায় সব বস্তুই সংঘাতের মাধ্যমেই সত্তাবান হয় এবং তিরােহিত হয়। হােমারের মানুষের মধ্য থেকে সংঘাত তিরােহিত হবার জন্য প্রার্থনা যদি পূরণ করা হত তাহলে সমস্ত বিশ্বজগতই ধ্বংস হয়ে যেত। মানুষ জানে না যে, যা সংঘাতপূর্ণ তা নিজের সঙ্গে কিভাবে সংগতিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ হল বিপরীত টানের (Tension) সমন্বয়বিধান, যা দেখা যায়, যখন ছড়ের আঘাতে বীণার তারে টান পড়ে এবং তার থেকে সুরের উৎপত্তি ঘটে।
  • কেবলমাত্র ভবনের (Becoming) অস্তিত্ব আছে। সত্তা, স্থায়ীত্ব, অভেদত্ব, এসব কিছুই অলীক, কেননা শুধু ভিন্ন ভিন্ন দ্রব্যই যে পরিবর্তিত হচ্ছে তা নয়, সমস্ত জগতই নিরন্তর গতিশীল ও পরিণামী। স্থিতিশীলতা, স্থিরতা – এ সবের কোন সত্যতা নেই। কাজেই সত্তা নয়, ভবনেরই একমাত্র সত্যতা রয়েছে। (এলিয়াটিক স্কুলেরবিপরীতে)
  • বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে অগ্নিই সবচেয়ে গতিশীল ও পরিবর্তনশীল। অগ্নি চিরচঞ্চল, এক মুহূর্তও পরিবর্তিত না হয়ে থাকতে পারে না। এই অগ্নি কখনও শিখারূপে ঊর্ধ্বে ধাবমান, কখনও ভস্মে পরিণত, আবার কখনও সেই ভস্ম থেকে উত্থিত ধূমরূপে ঊর্ধ্বে বিলীয়মান। তাই জগতের সব কিছুই এক মূল উপাদান বা পদার্থ থেকে উদ্ভূত। আবার অগ্নি দহন করে এবং বিজাতীয় বস্তুকে নিজের মধ্যে রূপান্তরিত করে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখে এবং আর একাধিক বস্তু থেকে উদ্ভূত হয়ে তাদের নিজেতে পরিণত করে এবং এই উপাদানের সরবরাহ ব্যতিরেকে এর ঘটবে মৃত্যু, এ হয়ে পড়বে সত্তাহীন। এই বিরােধ (Strife) এবং টান (Tension)-এর উপরই নির্ভর করছে অগ্নির অস্তিত্ব। তাই এই মূল উপাদান হল জল বা বায়ু থেকে অনেক সূক্ষ্ম পদার্থ। তা হল অগ্নি (Fire)। এই অগ্নি শুধু শিখা নয়, এটি সাধারণভাবে উষ্ণতা, এটি ঊর্ধ্বে ধাবমান বাষ্পশ্বাস। সবই অগ্নির দ্বারা গঠিত। এই জগৎ ঈশ্বর বা মানুষের দ্বারা নির্মিত নয়। এই জগৎ চিরকাল ধরেই এক আদি অন্তহীন প্রাণবন্ত অগ্নি। সব কিছুই অগ্নি থেকে উদ্ভূত হয়। অগ্নিতেই সব কিছুর লয়। অগ্নিই মূল উপাদান। বিশ্বের সব কিছুই অগ্নিরই ভিন্ন ভিন্ন রূপ বা প্রকাশ। সব কিছুই অগ্নির বদলে বিনিময় হয় এবং অগ্নি সব কিছুর বদলে বিনিময় হয়। অগ্নি প্রথম বায়ুতে রূপান্তরিত হয়, তারপর বায়ু থেকে জলে এবং জল থেকে মৃত্তিকায় পরিণত হয়। এই পরিবর্তন হলো নিম্নগামী বা Downward Path. আবার মৃত্তিকা পরিণত হয় জলে, জল বাতাসে এবং বাতাস অগ্নিতে। এটি হলো ‘ঊর্ধ্বগামী পথ’ (Upward Path). সব পরিবর্তন ঘটে একটা নিয়মিত শৃঙ্খলা অনুসারে। উর্ধ্বগামী এবং নিম্নগামী উভয় পথই এক।
  • এই জগৎ এক সদা-জীবন্ত অগ্নি এর কিছু পরিমাণ প্রজ্বলিত হয় এবং কিছু পরিমাণ নির্বাপিত হয়। কাজেই অগ্নি যেমন বস্তু থেকে গ্রহণ করে, প্রজ্বলিত করে, তাদের নিজের মধ্যে রূপান্তরিত করে, তেমনি অগ্নি যতটুকু গ্রহণ করে ততটুকু দেয়। কাজেই যদিও প্রতি ধরনের জড়ের যে দ্রব্য (Substance), তার অনবরত পরিবর্তন ঘটলেও সেই জড়ের সমষ্টিগত পরিমাণ থেকে যাচ্ছে। অগ্নির বিভিন্ন পরিমাণে, কমবেশি সমান অনুপাতে, প্রজ্বলিত হওয়া এবং নির্বাপিত হওয়ার জন্যই বস্তুর আপেক্ষিক স্থায়ীত্ব রয়েছে। এই পরিমাণের বিষয়টি, বা ঘটনাটি উচ্চগামী এবং নিম্নগামী পথের ভারসাম্য। এটাই বিশ্বের লুক্কায়িত সমন্বয়বিধান। যা প্রকাশিত তার তুলনায় এটা অনেক ভাল। তাই এই বিশ্ব অনবরতই পরিবর্তিত হলেও, কোনক্ষণেই তা স্থির না থাকলেও আমাদের মনে কেন এই জগতে বস্তুর স্থায়ীত্বের ভাব জাগে।
  • একের অস্তিত্বের পক্ষে বিরােধের অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী ও ‘এক’ হচ্ছে তার নিজেরই পার্থক্য এবং এই পার্থক্যগুলো নিজেরাই হচ্ছে ‘এক’। তারা একেরই বিভিন্ন দিক। এই পার্থক্যগুলো কখনও বিলুপ্ত হতে পারে না, তাহলে একেরই কোন অস্তিত্ব থাকে না। কাজেই একের এই বিভিন্ন দিক, উচ্চগামী পথ আর নিম্নগামী পথ কোনটাই বিলুপ্ত হতে পারে না। সুতরাং একের অস্তিত্বের পক্ষে এই বিরােধের অবিচ্ছেদ্যতাকে স্বীকার করে নিতেই হয়। একের বিভিন্ন মুহূর্তের স্বীকৃতিকে কোন মতেই অগ্রাহ্য করা চলে না। উপরের পথ আর নীচের পথ একই। আত্মার পক্ষে জলে পরিণত হওয়া এবং জলের পক্ষে মৃত্তিকায় পরিণত হওয়া, মৃত্যুরই সামিল কিন্তু জল মৃত্তিকা থেকে এবং জল থেকেই আত্মা আসে। একেতেই সব বিভেদের ঐক্য, সব পার্থক্যের সুসংগতি ও সব টানের (Tension) সমন্বয়বিধান সাধিত হয়। ঈশ্বরের কাছে সব কিছুই ভাল এবং সুন্দর এবং যথার্থ। কিন্তু মানুষই কিছু জিনিসকে ঠিক-বেঠিক মনে করে।
  • এই এক-ই হলো অগ্নি, প্রজ্ঞা (Logos) বা ঈশ্বর (God)। এই তিনটিই মূলে এক। ঈশ্বর সব এবং সবই ঈশ্বর। সর্বেশ্বরবাদ সত্য। ঈশ্বর হল এক সার্বিক বিচারবুদ্ধি, এক সার্বিক নীতি যা সব জিনিসের মধ্যে অন্তর্নিহিত থেকে সব বস্তুকে ঐক্যবদ্ধ করছে এবং এক সার্বিক নিয়মানুসারে বিশ্বের অবিরত পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
  • ইন্দ্রিয় এবং বিচারবুদ্ধি পৃথক। ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করে সত্যকে জানা যায় না। একমাত্র বুদ্ধির দ্বারাই সত্যকে জানা যায়। ভবনই (Beeoming) যে সত্য, বুদ্ধির দ্বারাই এই নীতি বােধগম্য হয়। মানুষের বিচারবুদ্ধি সার্বিক বিচারবুদ্ধিরই একটি মুহূর্ত মাত্র। কাজেই মানুষের উচিত বিচারবুদ্ধির সাহায্যে সত্যকে উপলদ্ধির জন্য সচেষ্ট হওয়া, বিচারবুদ্ধির সাহায্যে সবকিছুর ঐক্যকে বুঝে নিতে চেষ্টা করা। বিচারবুদ্ধি এবং চেতনা মানুষের মধ্যে অগ্নিময় উপাদান। তারা হল মূল্যবান উপাদান।
  • আত্মা কোন অশরীরী বস্তু বা ভুত বা ছায়া নয়। আত্মা সবচেয়ে বাস্তব বস্তু এবং এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ হল চিন্তন বা বিজ্ঞতা। আত্মা যখন জেগে থাকে, তখনই আত্মা পরিপূর্ণভাবে সজীব। নিদ্রা হল জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি অবস্থা। নিদ্রার সময় ইন্দ্রিয়ের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায় এবং বাইরের অগ্নি শুধুমাত্র নিঃশ্বাসের মধ্য দিয়েই আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়। কাজেই নিদ্রার সময়ে আমরা বিচারবুদ্ধি শূন্য এবং অচেতন হয়ে পড়ি, জগতের সাধারণ জীবন থেকে নিজেদের নিজস্ব একটা ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে আসি। আত্মার উচিত নিদ্রার জগৎ থেকে জাগ্রত অবস্থায় উত্তীর্ণ হওয়া অর্থাৎ কিনা, চিন্তা এবং বিচার-বুদ্ধির জগতে উত্তীর্ণ হওয়া।
  • মানুষের আত্মা ঐশ্বরিক অগ্নির একটা অংশ। এই অগ্নি যত শুদ্ধ আত্মা তত উৎকৃষ্ট বা নিখুঁত। শুষ্ক আত্মাই বিজ্ঞতম এবং শ্রেষ্ঠ। আর্দ্র হওয়াটা আত্মার পক্ষে আনন্দকর হতে পারে, কিন্তু আত্মার পক্ষে জল হওয়া তার মৃত্যুরই সামিল।
  • আত্মা যখন দেহকে পরিত্যাগ করে, আত্মা নির্বাপিত হয় না, যে জগৎ-অগ্নি থেকে আত্মা এসেছিল, সে সেখানেই ফিরে যায়।
  • আত্মা যেহেতু অগ্নি, অন্য অগ্নির মতই সে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে এবং তার পরিপূরণের প্রয়ােজন হয়। এটি সে ইন্দ্রিয় এবং শ্বাসের মাধ্যমে জগতের সাধারণ জীবন এবং বিচারবুদ্ধি থেকে প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ, চারপাশের পরিবেশ এবং সর্ব-ব্যাপক অগ্নি থেকে লাভ করে। এর মধ্যেই আমরা বাঁচি, নড়াচড়া করি এবং আমাদের অস্তিত্ব বজায় রাখি।
  • কোন মানুষেরই নিজস্ব আত্মা নেই। এটি হল এক সার্বজনীন আত্ম-অগ্নির অংশমাত্র। কাজেই এর সঙ্গে সংস্পর্শ বিনষ্ট হলে মানুষ বিচারবুদ্ধিশূন্য হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
  • বিশ্বের ঐশ্বরিক শৃঙ্খলায় বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত হয় সন্তোষ এবং এই সন্তোষই জীবনের পরমকল্যাণ।
  • মানবীয় জ্ঞানের সীমারেখা আছে। মানুষের ধারণা আপেক্ষিক।
  • মানুষের জগতেই নৈতিক মূল্যের যথার্থ আছে এবং অন্যান্য বস্তুর মত এদের বিরােধিতারও বিশ্বসঙ্গতিতে অর্থাৎ ঈশ্বরে সমন্বয় সাধিত হয়।

এম্পিডক্লিস (৪৯৪–৪৩৪ খ্রি.পূ.)

  • সত্তা হলো জড়াত্মক। সত্তার উৎপত্তিও নেই, ধ্বংসও নেই, সত্তা অ-সত্তা থেকে উৎপন্ন হতে পারে না, অ-সত্তাতে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে না। যা আছে তা বরাবরই তাই থেকে যায়। কাজেই জড়ের শুরুও নেই, শেষও নেই। জড় হল অবিনশ্বর, স্বয়ম্ভু। (পারমিনাইডিস প্রভাবিত, কিন্তু এখানে সত্তা জড়াত্মক)
  • জগতের বিভিন্ন বস্তু সব সময়ই পরিবর্তিত হচ্ছে। পরিবর্তনকে কোন মতেই অস্বীকার করা চলে না, বা নিছক ভ্রম প্রত্যক্ষণ বা অলীক বলে বাতিল করে দেওয়া যায় না। কিন্তু বস্তুর আবির্ভাব ও তিরােধান এরও ব্যাখ্যার প্রয়ােজন আছে। (হেরাক্লিটাস প্রভাবিত)
  • যখন বস্তুর পরিণাম বা পরিবর্তনের কথা বলা হয়, বস্তুর উৎপত্তি বা তার বিলুপ্তির কথা বলা হয়, তখন সমগ্র হিসেবেই বস্তুর উৎপত্তি এবং তার বিলুপ্তির কথা বলা হয়। কিন্তু বস্তু যে জড়কণার দ্বারা গঠিত, তাদের উৎপত্তি বা বিনাশ কিছুই নেই, তারা অবিনশ্বর।
  • যাকে সৃষ্টি এবং ধ্বংস বলে অভিহিত করা হয় তা প্রকৃতপক্ষে অনাদি এবং অপরিণামী মূল দ্রব্যের সংযােগ ও বিয়ােগ।
  • মৌলিক উপাদান হল চারটি – ক্ষিতি (Earth), অপ (Water), তেজ (Fire), এবং মরুৎ (Air), যারা ‘সব কিছুর মূল’। এই চারটি উপাদান হল অপরিবর্তনীয় এবং মৌলিক। এদের পারস্পরিক মিশ্রণ থেকেই জগতের যাবতীয় মূর্ত বস্তুর উৎপত্তি। জড় হল ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ-এই চারটি উপাদানেরই কিছু কিছু অংশের একত্র মিশ্রণ। উপাদানগুলোর সংযােগ এবং বিয়ােগ থেকেই যাবতীয় বস্তুর উৎপত্তি এবং ধ্বংস। কিন্তু উপাদানগুলোর উৎপত্তিও নেই, ধ্বংসও নেই। তারা সব সময় অপরিণামী থেকে যায়।
  • শূন্য স্থান বলে কিছু নেই। শূন্য ঘন হল শূন্যতা, কিছুই নয়, অদৃশ্য। সব উপাদানই স্থান জুড়ে আছে। উপাদানগুলোর একটা সুনির্দিষ্ট বিস্তৃতি আছে এবং প্রতিরােধের শক্তি আছে।
  • রাগ ও দ্বেষ চারটি উপাদানকে একত্র করে বিভিন্ন জড়বস্তু গঠন করে। দ্বেষ বা সংঘাত (Strife) উপাদানগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে বস্তুর সত্তার বিনাশ সাধন করে। এই রাগ ও দ্বেষ হলো জগতে আকর্ষণ ও বিকর্ষণের যান্ত্রিক শক্তির ক্রিয়ার প্রকাশ।
  • জগতের সৃষ্টি ও ধ্বংস চক্রবৎ সংগঠিত হয়, এই অর্থে যে, নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে জগতের সৃষ্টি ও প্রলয় ঘটে। কাজেই এক হিসেবে জগতের পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় কোন আদি বা অন্ত নেই।
  • শুরুতে অর্থাৎ আদিম মণ্ডলে (Sphere) সমস্ত উপাদানগুলো, অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ সম্পূর্ণভাবে একত্র মিশ্রিত বা ঐক্যবদ্ধ ছিল। বিশেষ বিশেষ মূর্ত বস্তুর সৃষ্টির জন্য তখনও তারা পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। মন্ডলের যে কোন অংশে ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ – এর সমান পরিমাণেই অস্তিত্ব ছিল। আদিতে রাগ (Love) বা সঙ্গতি (Harmony) সমগ্র মন্ডলে নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি হিসেবে ক্রিয়মান ছিল। সমগ্র মন্ডলটিকে বলা হত ‘পরমানন্দময় ঈশ্বর’ (Blessed God)। তখনও পর্যন্ত দ্বেষের আবির্ভাব ঘটেনি বলে সৃষ্টি ও শুরু হয়নি। দ্বেষ মন্ডলের বাহিরে সর্বক্ষণ অস্তিত্বশীল ছিল। দ্বেষ ক্রমশ পরিধি থেকে কেন্দ্রের দিকে প্রবেশ করতে শুরু করলে উপাদানগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থা থেকে শিথিল হওয়ার বিষয়টি শুরু হয়ে গেল। সমজাতীয় উপাদানগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিশে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন উপাদানগুলো পরস্পরের থেকে একেবারে পৃথক হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতে লাগল। যেমন সব জলকণা এক জায়গাতে এবং সব অগ্নিকণাগুলো এক সঙ্গে জড় হল। বিচ্ছিন্ন হবার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হলে দ্বেষেরই প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হল এবং রাগ সম্পূর্ণভাবে বিতাড়িত হল। কিন্তু রাগ আবার তার কাজ শুরু করে দেয়। বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলোকে রাগ একত্রিত করতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বজগৎ আবার তার পূর্বাবস্থায় উপনীত হয়। এরপর দ্বেষ আবার তার কাজ শুরু করে। এভাবে চক্রবৎ রাগ ও দ্বেষের ক্রিয়া চলতে থাকে।
  • আদিম গােলক এবং উপাদানগুলোর সমপূর্ণভাবে ঐক্যবন্ধন শিথিল হওয়া – এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থায় হল আমাদের এই জগৎ। দ্বেষ (Hate) ক্রমশ গােলকের মধ্যে প্রবেশ করে রাগকে বহিষ্কৃত করার জন্য সচেষ্ট হয়। এই গােলকের মধ্য থেকে যখন আমাদের এই জগৎ গঠিত হতে থাকে, তখন বায়ু হল প্রথম উপাদান যেটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তারপরে তেজ, তারপর ক্ষিতি। জগতের চক্রবৎ ঘূর্ণন বা আবর্তনের বেগের জন্যই তার থেকে জল নিষ্পেষিত হয়। আকাশের দুটি অংশ। এক অংশ অগ্নি এবং সেটিই হল দিন। অপর অংশ হল অন্ধকার জড় যার মধ্যে অগ্নি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত এবং এই হল রাত্রি।
  • আত্মার জন্মান্তরবাদ বা দেহান্তরপ্রাপ্তি সত্য। আমি অতীতে একজন বালক, বালিকা, গুল্ম , পাখি এবং সমুদ্রে বসবাসকারি মৎস্য ছিলাম।
  • চিন্তন ও প্রত্যক্ষণের মধ্যে পার্থক্য নেই। চিন্তন দেহেরই ক্রিয়া, যে দেহ উপাদানের দ্বারা গঠিত।
  • একই ধরনের পদার্থ দ্বারা একই ধরনের পদার্থ জ্ঞাত হয়। ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে অবস্থিত উপাদানের সঙ্গে আমাদের বাইরে অবস্থিত উপাদানের মিলন ঘটে। আমাদের মধ্যে ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ যথাক্রমে বাইরে অবস্থিত ক্ষিতি, অপ, তেজ: ও মরুৎকে জানে। চাক্ষুষ-প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে, যেহেতু চক্ষু অগ্নি এবং জলের দ্বারা গঠিত, চক্ষুর মধ্যে অবস্থিত অগ্নি এবং জলের প্রবাহ (Effluence) বাহ্য বস্তুতে অবস্থিত জল প্রবাহের সঙ্গে মিলিত হয়।
  • ঈশ্বর পবিত্র, বাক্যের অতীত চিৎপদার্থ। এই পবিত্র চেতন সত্তা তার চিন্তার দ্বারাই সমস্ত জগতে ব্যাস্ত হয়ে আছেন এবং তার নীতিই সমস্ত কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ঈশ্বর ব্রহ্মাণ্ড গােলকের সঙ্গে অভিন্ন।
  • জগৎ ব্যাখ্যায় চারটি মৌলিক উপাদান এবং এর অতিরিক্ত রাগ ও দ্বেষের দরকার হচ্ছে, তাই বহুত্ববাদ সত্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *