দেখুন আমরা গর্ব করি, বিশ্বকে জানাই যে আমরা মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দিয়েছি। আমরা রক্ত দিয়েছি বাংলায় কথা বলার জন্যে। এখন আমাদের বাংলায় কথা বলার অধিকার আছে। ভাষা পেয়েছি, শব্দ পেয়েছি। সেই সুন্দর ভাষায় আমরা কী বলব? এটা কি শুধুমাত্র সাধুবাদ দেওয়ার জন্য? বিষোদগার করার জন্য? নাকি গভীর, সারগর্ভ, সংবেদনশীল, অর্থপূর্ণ ও সুন্দর কিছু প্রকাশের জন্য? সৃজনশীলতা, মৌলিকতা ও অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ ধারণা আমরা এসব শব্দের মধ্যমে প্রকাশ করতে পারি। সেই সুযোগ কোথায়?
আমরা আমাদের দুঃখ, কষ্ট, সংগ্রাম, স্বপ্ন, প্রতিবাদের কতটুকু তুলে ধরতে পারি? এখানেই সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে, যা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনকে টিকিয়ে রাখে, সেটা হচ্ছে ‘চিন্তার স্বাধীনতা’। আমরা চিন্তার স্বাধীনতা কতটা পাই?
আমাদের ভাষা আন্দোলনের এই মাসে আমি সেই গানের কথা স্মরণ করতে চাই, যে গান আমরা গেয়েছি ছাত্রজীবনে। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়’। ওরা আমার মুখের ভাষা কেন ‘কাইরা নিতে’ চেয়েছিল? যাতে আমরা আমাদের অনুভব, সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে না পারি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিবাদ যেন করতে না পারি। পাকিস্তানিরা এটাই করতে চেয়েছিল। তারা আমাদের ‘না’ বলার ক্ষমতা কেড়ে নিতে চেয়েছিল।
গানের আরেকটি লাইন হচ্ছে, ‘ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে-পায়ে’। এই শিকলটা কী ছিল যেটা পাকিস্তানিরা আমাদের হাতে-পায়ে পরাতে চেয়েছে? তারা শিকল পরাতে চেয়েছে, যেন আমরা বন্দি থাকি।

আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, পাকিস্তানিরা চলে গেছে। কিন্তু উদ্বেগের সঙ্গে বলছি, আজও আমাদের শিকল পরানো হচ্ছে। নিজের অজান্তেই আজ আমরা জ্ঞানার্জনের স্বাধীনতা বিসর্জন দিচ্ছি। আমাদের সমাজে মুক্ত চিন্তার স্বাধীনতা নাই৷ কেউ চিন্তা করে মত প্রকাশ করলে অভিজিৎ রায়ের মত মরতে হচ্ছে।
এটা তো মৌলিক অধিকার। বেঁচে থাকতে যেমন অক্সিজেন গ্রহণ করতে হয়, তেমনি বিকাশের, এগিয়ে যাওয়ার, নতুনত্বের অক্সিজেন হচ্ছে মুক্তচিন্তা। অক্সিজেন না থাকলে আমরা যেমন মারা যাব, একই ভাবে মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা না থাকলেও আমরা সৃজনশীলতা হারিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস আমাদের মেরে ফেলবে।
মুক্তচিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী আমি একজন ছোট মানুষ হিসেবে মুক্তচিন্তার স্বাধীনতার অভাবের কথা প্রকাশ না করে পারছি না। একটি মুহূর্তের জন্য হলেও ভেবে দেখুন, মুক্তচিন্তাহীন একটি সমাজ কেবল সামাজিকতার জন্যই থাকতে পারে, উদ্ভাবনের জন্য নয়। আর কত?
