বাংলাদেশে যেকোনো “ভিন্নস্বরে কথা বলা” আজ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বিশেষত যারা ধর্ম, বিশ্বাস বা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন তোলেন — তাদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসের হুঙ্কার বেড়েই চলেছে। এমন একটি গাম্ভীর চিত্র আমাদের সামনে আলোর মতো স্পষ্ট: ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়েছিল মাত্র তার যুক্তি ও মুক্তচিন্তার জন্য, আর এখন সেই হত্যা প্রকৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন আসামিকে আদালত জামিন দিয়েছে।
২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, অভিজিৎ রায় তাঁর স্ত্রী বন্যা আহমেদ বোন্যার সঙ্গে ঢাকার একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিল এক পরিকল্পিত হামলা — হত্যা করা হয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে, এবং ঘটনা ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
এই মামলায় পরে ৫ জন জঙ্গিকে ফাঁসি, আর একজন — শফিউর রহমান ফারাবী–কে জীবনভর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতের রায়ে বলা হয়, তারা শুধু এক ব্যক্তিকে হত্যা করেনি; তাদের উদ্দেশ্য ছিল “লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের বিরুদ্ধে ভয় সৃষ্টি করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করা এবং দেশে গণতান্ত্রিক, অ-ধর্মান্ধ চরিত্রের রাষ্ট্রকে বাধাপ্রদর্শন করা”।
কিন্তু ৩০ জুলাই ২০২৫–এ ঢাকার হাইকোর্ট একটি বেঞ্চ বিচারপতি জাকির হোসেন ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রায়ের মাধ্যমে ফারাবীকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দান করে। তিনি পরে ২২ আগস্ট ২০২৫ তারিখে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান।https://www.tbsnews.net/bangla/bangladesh/news-details-371706
এই ঘটনাটি শুধু এক ব্যক্তির মুক্তি নয় — এটি একটি গম্ভীর প্রতীক, একটি সংকেত: যে দেশে মুক্তচিন্তা, নাস্তিকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে সহিংসতা করা হয়, সেটি আজ বিচার ব্যবস্থার নজরেও প্রশ্নবিদ্ধ। একজন হত্যাকারীর জামিন মানে কি, বিচার ও ন্যায্যতার প্রতি আস্থা কমে গেছে? নাকি এটি আইনশৃঙ্খলা ও আদালতের পক্ষ থেকে এক ধরনের স্থবিরতার প্রতিফলন?
একজন নাস্তিক হিসেবে, আমি বলি: মতপ্রকাশ এবং মুক্তচিন্তার অধিকার শুধুমাত্র একটি স্বলম্বন দৃষ্টিভঙ্গা নয়; এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার। যদি সেই অধিকারই আজ বিচার ব্যবস্থায় অপ্রতুল সুরক্ষা পায়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ ভয়ঙ্করভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
আমাদের আহ্বান:
- আদালত ও সরকারকে স্পষ্টভাবে আবেদন করা উচিত — যারা উগ্রবাদী পথ অবলম্বন করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় আঘাত করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
- নাগরিক সমাজ, মুক্তচিন্তক এবং নাস্তিকদের সক্রিয় হতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে, এবং তাদের ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা রক্ষায় সংগঠিতভাবে কাজ করতে হবে।
- আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টিও জরুরি — কারণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু একটি দেশে সীমাবদ্ধ বিষয় নয়; এটি সার্বজনীন মূল্যবোধ।
বাংলাদেশ এখন এক রকম রূপান্তরের মুহূর্তে রয়েছে। উগ্রবাদী শক্তি যদি শাসন করে, তাহলে “স্বাধীনতা” কেবল একটি স্মৃতি হয়ে যাবে। কিন্তু যদি আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলি — আইন, বিচার, এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর — তাহলে ঠিকই পাথেয় করতে পারি সেই মুক্ত, সহনশীল ও যুক্তিপর সমাজকে, যার জন্য অভিজিৎ রায় তার জীবন তাঁর কলম দিয়েও লড়েছিল।
