পারিবারিকসূত্রে প্রাপ্ত ধর্ম

আমরা প্রায় সব মানুষই কোন একটি পরিবারে জন্ম নিই। স্বাভাবিকভাবেই, সেই পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়েই আমরা বড় হয়ে উঠি। বাবা মা যদি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহই একমাত্র ঈশ্বর, কোরআনই একমাত্র সত্য, তাহলে সেইসব বিশ্বাস করেই বড় হই। বাবা মা যদি হিন্দু হয়, আমরাও হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস নিয়ে বড় হই। তারা যেই ধর্মের শিক্ষাই আমাদের দেন, সেই শিক্ষা নিয়েই আমাদের মন মানসিকতা গড়ে ওঠে। ঈশ্বর সম্পর্কে, ধর্ম সম্পর্কে আমাদের ধারণা উনারাই বেশ ভালভাবে তৈরি করে দেন। ঈশ্বরের কেমন হওয়া উচিৎ, ঈশ্বরের মূর্তি থাকা উচিৎ কী অনুচিত, ঈশ্বর একজন নাকি একাধিকজন, ধর্মে কী থাকা উচিৎ, সেইসব বিষয়ে সবচাইতে বেইসিক ধারণা আমরা পাই পরিবার থেকেই। এরপরে এলাকার বন্ধুরা, আত্মীয় স্বজন, নানানানী দাদাদাদী চাচাচাচী মামামামী, এরা আমাদের নানান ধর্মীয় গল্পকেচ্ছা বলে। স্কুলের শিক্ষকগণ আমাদের ধর্মের বিভিন্ন ব্যক্তির গল্প বলেন। এই সবের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের ধারণা তৈরি হয়। বাঙলাদেশে একটি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলে এবং মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে থাকলে আশেপাশের সবাই একজনকে ইসলাম ধর্মের সত্যতা সম্পর্কেই বলবে, এবং অন্য ধর্মগুলো যে কত মিথ্যা আর বিকৃত সেটিই বলবে। ভারতে হিন্দু পরিবারে জন্ম নিলে এবং হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে থাকলে আশপাশের সবাই হিন্দু ধর্ম যে কত পুরনো এবং সঠিক, সেটিই বলবে। এরকম সবদেশেরই একই চিত্র।

একইভাবে, কোন দেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সংবাদপত্র, রেডিও টিভি ইত্যাদিতেও মুসলিমদের পছন্দের নাটক সিনেমা প্রচারিত হবে। আবার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে টিভিতে প্রচার হবে রামায়ন বা মহাভারত। খ্রিষ্টান বা ইহুদী বা বৌদ্ধদের দেশেও একই অবস্থা। এসব দেখে শুনে বড় হতে হতে এই বিষয়গুলোকেই একজন মানুষ সত্য মনে করে বড় হবে। ছোটবেলার শিক্ষা মানুষের মনে খুব গভীর প্রভাব ফেলে। ছোটবেলায় শেখা খুব সাধারণ জিনিসও আমরা বহুকাল মনে রাখি।
আশপাশের মোটামুটি সবাই যদি আমাদের শেখান যে, দেবদেবী আছে, আমরা সেইভাবেই চিন্তা করতে শিখি। তারা যদি আমাদের শেখান আল্লাহ বা যীহোভা আছে, আমাদেরও সেইগুলোই সত্য বলে মনে হয়। তারা যদি ছোটবেলা থেকে আমাদের মূর্তি পুজা করতে শেখান, সেই কাজটিই আমাদের কাজে যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক মনে হয়। তখন যদি আমাদের মুসলিম বন্ধুরা আমাদের বলে, তাদের আল্লাহকে দেখাই যায় না, তখন আমাদের খুব হাসি পায়। মনে হয়, এ আবার কেমন ঈশ্বর রে বাবা, দেখাই যায় না। নাই ঈশ্বরকে আবার কেমন পুজা?

আবার, আমরা যদি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিই, আমাদের ধারণা দেয়া হয় যে, ঈশ্বর বা আল্লাহকে কেউ দেখতে পায় না। তখন আমাদের হিন্দু বন্ধুরা যখন দেবদেবীর ছবি আমাদের দেখায়, বা আমরা কোথাও মূর্তি দেখি, আমাদের খুব হাসি পায়। মনে মনে বলি, এ আবার কেমন ঈশ্বর রে বাবা, এদের ঈশ্বরকে আবার দেখা যায়। এদের চারটা হাত, দুইটা মাথা, কারো কারো আবার হাতির মাথা, কী হাস্যকর! এই ঈশ্বরগুলো তো একদমই মানুষের মত, বা জীবজন্তুর মত। হাতির মাথাওয়ালা তো ছাড়, কয়েকটা আরো বেশি উদ্ভট দেখতে। দশ হাত তিন মাথা, এগুলো কী উদ্ভট ধর্ম রে বাবা।

কিন্তু এই আমরাই যদি ঘটনাক্রমে ঐ ধর্মের পরিবারে জন্ম নিতাম, তাহলে আমাদের ছোটবেলা থেকে সেই শিক্ষাটিই দেয়া হতো। এবং সেগুলোই আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হতো। যেমন ধরুন, আমি একটি বাঙালি পরিবারে জন্ম নিয়েছি। আমার কাছে বাঙলা ভাষাটা খুবই সহজ এবং এরকম ভাষাকেই আমার মনে হয় দারুন! যখন জার্মান ভাষা শিখতে শুরু করলাম, তখন মনে হতো, কী উদ্ভট ভাষা রে বাবা! আবার একজন জার্মানও যখন বাঙলা ভাষা শিখতে যাবে, তার কাছেও ঐ ভাষাটি উদ্ভট মনে হতে পারে। আবার ধরুন, আমাদের সংস্কৃতিতে ঈদের দিনে পাঞ্জাবি পড়ে অন্য বাসায় বেড়াতে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু অন্য দেশের বা অন্য সংস্কৃতিতে আবার এইরকম উৎসবের দিনে মানুষ রাস্তায় নেমে নাচগান করে। ঐসব দেখলে আমাদের উদ্ভট মনে হয়। আবার, তারা যখন আমাদের আচার আচরণ দেখে, তাদের কাছেও সেটি উদ্ভট মনে হয়। এসবের কারণ হচ্ছে, ছোটবেলা থেকে আমরা যেই পরিবেশে বড় হই, সেই সংস্কৃতিই আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়।

মাঝে মাঝে আমাদের মনে ধর্ম বিষয়ে নানা প্রশ্ন জাগে। আমরা আমাদের ধর্মেরই কোন না কোন ধর্মগুরু, কিংবা স্কুলের শিক্ষক অথবা গুরুজনদের সেই নিয়ে প্রশ্ন করি। উত্তর আসলে যেমনই হোক, সন্তোষজনক অথবা অযৌক্তিক, আমাদের মেনে নিতে হয়। তারা আমাদের নানাভাবে মিথ্যা বলে, নানা গোঁজামিল দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করেন, ধর্মে যা আছে সেটিই সঠিক। যেমন ধরুন, আমরা যদি হিন্দু ধর্মে জন্মগ্রহণ করি, এবং মূর্তিপুজা করি, মন্দিরে যাই, মাঝেমাঝে ভিন্ন ধর্মের লোক এসে আমাদের মূর্তিগুলো ভেঙ্গে দিয়ে যায়। তখন আমাদের প্রশ্ন জাগে, এইসব মূর্তি, যা আমরা পুজা করি, সেগুলোর আসলেই কি কোন ক্ষমতা আছে? ক্ষমতা থাকলে বিধর্মীরা আমাদের মুর্তি এবং মন্দির ভেঙ্গে দিয়ে গেল কীভাবে? তখন আমাদের ধর্মগুরুরা নানা গোঁজামিল দিয়ে আমাদের বুঝ দেয়। অযৌক্তিক হলেও সেই কথাগুলোই আমাদের মেনে নিতে হয়।

আবার আমরা যদি মুসলিম বা খ্রীষ্টান ধর্মের পরিবারে জন্ম নিই, মাঝে মাঝে বিধর্মীরা আমাদের মসজিদ ভেঙ্গে দিয়ে যায়, কোরআন পুড়িয়ে দিয়ে যায়। এমনকি, কাবা শরীফেও অনেকবার আক্রমণ হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্ঘটনায় কাবা শরীফ ধ্বংসের ঘটনাও ঘটেছে। তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, আসলেই কী আল্লাহর কোন ক্ষমতা আছে? ক্ষমতা থাকলে এগুলো হয় কীভাবে? আমরা সেইসব প্রশ্ন নিয়ে ধর্মগুরুদের কাছে গেলে, তারাও ঠিক একইভাবে ভুংভাং দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দেন। কথাগুলো যত অযৌক্তিকই হোক না কেন, যেহেতু ধর্মগুরুরা এগুলো বলেছে, আমাদের মেনে নেয়া ছাড়া আসলে আর কোন পথ থাকে না।

এর মানে হচ্ছে, আমরা আসলে যেই পরিবারে জন্ম নিই, বেশিরভাগ সময়ই ঘুরে ফিরে আমাদের সেই ধর্মের অনুশাসনই মানতে হয়, অথবা আমরা মানতে বাধ্য হই। মাঝে মাঝে কিছু মানুষ ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করে, বা নাস্তিক হয়ে যায়। এটি ইসলামের ক্ষেত্রেও যেমন সত্য, অন্য ধর্মের বেলাতেও সত্য।

সাধারণভাবে আমরা বুঝি, মানুষ কোন পরিবারে জন্মেছে, কোন শিক্ষা পেয়েছে, কোন পরিবেশে বড় হয়েছে, এগুলোর ওপর ভিত্তি করে কাউকে বিবেচনা করা বিষয়টি ছোটলোকের কাজ। কিন্তু আল্লাহ এবং তার নবী কী এই দোষে দুষ্ট ছিল? আসুন হাদিস কী বলে দেখি [2] –

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-১ঃ ঈমান (বিশ্বাস)
পরিচ্ছেদঃ ৩. দ্বিতীয় ‘অনুচ্ছেদ – তাকদীরের প্রতি ঈমান
১১১-(৩৩) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! মু’মিনদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের (জান্নাত-জাহান্নাম সংক্রান্ত ব্যাপারে) কী হুকুম? তিনি উত্তরে বললেন, তারা বাপ-দাদার অনুসারী হবে। আমি বললাম, কোন (নেক) ‘আমল ছাড়াই? তিনি বললেন, আল্লাহ অনেক ভালো জানেন, তারা জীবিত থাকলে কী ‘আমল করতো। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা মুশরিকদের (নাবালেগ) বাচ্চাদের কী হুকুম? তিনি বললেন, তারাও তাদের বাপ-দাদার অনুসারী হবে। (অবাক দৃষ্টিতে) আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন (বদ) ‘আমল ছাড়াই? উত্তরে তিনি বললেন, সে বাচ্চাগুলো বেঁচে থাকলে কী ‘আমল করত, আল্লাহ খুব ভালো জানেন। (আবূ দাঊদ)(1)
(1) সহীহ : আবূ দাঊদ ৪০৮৯। শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন : হাদীসটি দু’টি সানাদে বর্ণিত যার একটি সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *